কলকাতা মহানগরী এখন ভারতের কালচারাল সিটি বা সাংস্কৃতিক শহর। কেউ কেউ একে সাংস্কৃতিক রাজধানীও বলে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, যখন সদর নিজামত মুর্শিদাবাদ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কলকাতায় এলো, তখন তা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী, পরে অবিভক্ত ভারতের রাজধানী ছিল। আরো পরে তা হয়ে গেল অবিভক্ত বঙ্গের রাজধানী। তার মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাতেই বেনিয়া-জমিদার সামন্ত প্রভু- উচ্চ ব্রাহ্মণদের শহরে পরিণত হলো কলকাতা। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ব্রিটিশদের তৈরি করা তৎকালীন বাবু সমাজ এই কলকাতার বুকে গড়ে উঠেছিল যারা মনুবাদী দর্শন তথা উচ্চবর্ণবাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদ গড়ে তোলে। এদেরই পূর্বসূরিদের হাত ধরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল হিন্দুমেলা (১৮৭২ সাল)। পরে হিন্দুমেলা ও জাতীয় সভা মিলে গঠিত হয় হিন্দু মহাসভা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও সবশেষে ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে লক্ষেèৗ শহরে গঠিত হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। এদের পূর্বসূরিরা কাশিমবাজার থেকে কলকাতা পর্যন্ত পলাশী ব্লুপ্রিন্টের ষড়যন্ত্রী। এখন সংঘের শাখা-প্রশাখা, রাজনৈতিক সংগঠন, অঙ্গ সংগঠন ও পার্শ্বসংগঠন মিলে সংখ্যা তিন শতাধিক। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হারিয়ে কলকাতার জমিদার সামন্ত প্রভুরা আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে দুর্গাপুজো করেছিল যা ঐতিহাসিক সত্য। এই আরএসএসসহ সংঘ পরিবার মনুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী। এই মনুবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও উচ্চ বর্ণবাদ একেবারেই সমার্থক। সংঘ পরিবার যে হিন্দুত্ববাদের জয়গান করে তা ব্রাহ্মণ্যবাদ ও উচ্চ বর্ণবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তারা বৃহত্তর হিন্দু সমাজের প্রতিনিধি নয়। এই সংঘ পরিবারের গঠনতন্ত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমান, খ্রিষ্টান ও কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীরা তাদের ঘোষিত শত্রু। কিন্তু বৃহত্তর হিন্দু সমাজের দলিত-আদিবাসী-এসসি-এসটি-শিখ-জৈন-বৌদ্ধরাও শত্রু। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম হয়েছিল ব্রাহ্মণ্যবাদ বিকৃতির বিরুদ্ধে। তাই এদেরও আরএসএস ভালো চোখে দেখে না। আর ভারতের রাজনৈতিক আকাশে কংগ্রেস ও তার জোটবন্ধুরা আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক শত্রু। এটাই মোদ্দা কথা। এরা ভারতকে বিরোধীশূন্য করতে চায়।
আমাদের আরো মনে রাখতে হবে, এই আরএসএস গঠনের পর বিগত শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকের মধ্যেই ইতালির ফ্যাসিবাদী মুসোলিনি ও নাৎসি হিটলারের সাথে তারা দেখা করে। মনে রাখতে হবে, হিটলার নিজেকে দাবি করতেন আর্য-সন্তান। শুধু হিন্দু নয়, এই সমাজের মধ্যে যে পিতৃতান্ত্রিক ধারা প্রবহমান, সংঘ পরিবার তাকেই বরণ করে ও মানে। তাকে মেনে নিতেও বদ্ধপরিকর। আর সেইভাবেই তাদের সব কর্মসূচি রূপায়ণে ব্যস্ত। এ কথা আজ দিনের আলোর মতো সত্য যে, ২০১৪ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বে ও তার জমানায় উচ্চ বর্ণবাদ ও মনুবাদী দর্শনকে লাগামহীনভাবে কার্যকর করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে গরুর মাংসকে অজুহাত করে কত মুসলিম যুবককে খুন ও নির্যাতন করা হয়েছে তা স্মরণযোগ্য। পাশাপাশি দলিত সন্তান রোহিত ভেমুলাকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। আদিবাসী অধ্যুষিত ছত্রিশগড়ে মাওবাদী তকমা লাগিয়ে আদিবাসী জনবসতি এলাকায় সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়ে তাদের খুন করা হয়েছে। তাদের এই খুনের সংখ্যা নিরূপণ করা দুঃসাধ্য। উত্তর-পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মনিপুরে আজ দু’বছর ধরে চলছে আদিবাসী-জাতি দাঙ্গা যার বলি হাজার হাজার আদিবাসী। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রীর জমানায় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজের প্রগতিশীল চিহ্ন আজ বিলুপ্ত। মুক্তমনের মানুষকে আরএসএস খুন করেছে। নামের সংখ্যা দীর্ঘ। ইরফান হাবিব বা রোমিলা থাপারের মতো আন্তর্জাতিক মানের তারকা ইতিহাসবিদদের নানাভাবে অপমানিত হতে হচ্ছে। ভারতের সংবিধানের রূপকার বাবা সাহেব আম্বেদকরকে পার্লামেন্টে অপমান করছেন খোদ বিজেপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও অপমানিত। ভারতের প্রগতির যে শাখাটি এতদিন পর্যন্ত প্রজ্বলিত ছিল তা মোদির জমানায় একরকম খান খান হয়ে গেছে।
মোদির জমানা কার্যত ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক। এই পিতৃতন্ত্র গোটা দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা ধর্মভেদের ওপর শুধু ক্ষমতার ভর রাখতে সম্মত নয়, জাতিভেদ, লিঙ্গভেদের ওপরও তাদের ক্ষমতার অমোঘ দণ্ড কায়েম করতে বদ্ধপরিকর।
যে মনুবাদকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের এত মাতামাতি সেই মনুবাদ বা মনু কী? তাও আলোচনাসাপেক্ষ। মনু কোন সময়ের তা নিয়েও পণ্ডিতমহলে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মনুবাদের নির্দিষ্ট কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার কোনো পণ্ডিত মনে করেন, মনু কৌটিল্যের পরবর্তী সময়ের লেখক। বিশিষ্ট পণ্ডিত মুরারি মোহন শাস্ত্রী মনু সংহিতার অনুবাদ করতে গিয়ে বলেন, খ্রিষ্টাব্দ দিয়ে মনুর সময়কালকে চিহ্নিত করা যায় না। কেননা খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর রচনাতে মনু সংহিতার উদ্ধৃতি পরিলক্ষিত। তবে পণ্ডিতমহল একটি ব্যাপারে একমত যে, মনু সংহিতার যে পাঠ এখন হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে তার রচনাকাল খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী। ভারতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রসার লাভের পর হিন্দুধর্মের সনাতন বৈশিষ্ট্যগুলো যখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখনই হিন্দুত্ববাদকে প্রাসঙ্গিক করতে সক্রিয় হয় মনুবাদীরা। তারা মনুর ধারণা ও তত্ত্বকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা দিতে সচেষ্ট হয়। মনু সংহিতার ১২টি অধ্যায় রয়েছে। মোট শ্লোকের সংখ্যা ১৬৯৪টি। রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে মনুর চিন্তা লিপিবদ্ধ থাকলেও আজকের অদ্বৈতবাদী বিজ্ঞানের যুগে তা কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক হতে পারে না। তার পরেও বিজেপি সরকার সেই মনুবাদকেই সাংবিধানিক বৈধতা দিতে মরিয়া। এক কথায় তৎপর।
মনু বৈদিক যুগের বর্ণাশ্রমের তত্ত্বকে আরো কঠোরভাবে পালনের বিধান দিয়েছেন। বৈদিক যুগের বর্ণাশ্রম ও বর্ণভেদ মনুর মতে খুব স্পষ্ট। এই বর্ণভেদ প্রথা উচ্চবর্ণবাদ তথা ব্রাহ্মণ্যবাদকে উসকে দিয়েছে।
অথচ বৈদিক যুগে যে নারীসমাজে পরিবার ও সমাজগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাকে মোটেই পাত্তা দেয় না আরএসএসসহ সংঘ পরিবার। মনু বৈদিক যুগের মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দিলেন। বেদমন্ত্র উচ্চারণ করা নারীসমাজকে ঘরবন্দী করে দিলেন মনু। মনু বিধান দিলেন, নারীরা সংসার ধর্ম পালন ও সন্তান পালন করবে। অন্য কোনো কাজে তাদের কোনো অধিকার নেই। ফলে সমাজে নারীর অধিকার ধ্বংস করেছে মনুবাদীরা। আজকে বিজেপি-আরএসএস নারীর সংসারধর্ম পালন ও সন্তান পালনের কথাটা গলাবাজি করে বেশি বলছে। খোদ আরএসএস সুপ্রিমো মোহন ভাগবত এই তত্ত্বটিই বেশি চাউর করছে। বৈদিক যুগের মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা একেবারে কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিণত হলো। ফলে এই মনুর হিন্দুত্ববাদ কার্যত পরিণত হলো উচ্চ ব্রাহ্মণ্যবাদে। এক কথায় তা হয়ে গেল উচ্চ বর্ণবাদে। বর্তমানে ভারতে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি সরকার মনুর সূত্র মেনেই নারীর ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করছে। আড়াই হাজার বছর আগে মনুর ভারত যে অবস্থানে ছিল, সংঘ পরিবার সেই অবস্থানে ফিরে যেতে চাইছে। আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বিজেপিসহ সংঘ পরিবার যে হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে তার সংবিধান বলতে মনু সংহিতাকেই বোঝায়। তারা ভারতের সংবিধান বা শাসতন্ত্রকে একেবারেই ‘ডোন্ট কেয়ার’। তাই তারা ভারতের সংবিধানের রূপকার বাবাসাহেব বিআর আম্বেদকরকে কটূক্তি করে সংসদের মধ্যেই। স্বয়ং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আম্বেদকরকে নিয়ে কটূক্তি করেন। আম্বেদকরের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়, ‘We the People of India’. সেখানে কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। সেখানে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করা হয়নি। দৃঢ়তার সাথে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা হয়েছে। ভারতের সংবিধানে বিশেষ কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় আনুগত্য একেবারেই উপেক্ষিত। নিজ নিজ ক্ষেত্রে ধর্মাচরণ করা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করার অধিকার দিয়েছে। মনু ও মনুবাদকে অনুসরণ করে আরএসএস-বিজেপি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে চায়। আর মনু সংহিতা হলো তার সংবিধান। এই হলো উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুত্ববাদীদের আসল চরিত্র।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক



