বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারসেপশন একটি বড় ফ্যাক্টর। অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। একটি দল কী করছে, তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়- মানুষ কী মনে করছে, তারা কী করছে। এ জায়গাতে এসে বিএনপি সরকারের প্রথম দুই মাসের চিত্র খুব সুখকর নয়।
ক্ষমতায় আসার পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি, যে জন-আন্দোলন, যে ‘জুলাই বিপ্লব’-তার প্রতি দলটির অবস্থান এখন অস্পষ্ট। এটি কৌশলগতভাবে সুবিধার নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন ছাড়া বিএনপির ক্ষমতায় আসা সম্ভব হতো না- এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই আন্দোলনের কর্মীদের আজ প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে- এমন অভিযোগ এখন শুধু সামাজিক মাধ্যমে নয়, মূলধারার আলোচনাতেও উঠে আসছে। এটি কোনো ভালো বার্তা দেয়। বার্তাটি হলো- ক্ষমতায় যাওয়ার পর আন্দোলনের শক্তিকে অস্বীকার করা যায়। রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু ফল সবসময় খারাপ হয়েছে। ইতিহাস বলে, যে দল নিজের প্রকৃত শক্তি অবমূল্যায়ন করে, সে দল দ্রুত জনসমর্থন হারায়। রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ‘এন্টি-ইন্ডিয়া’ ভাবমর্যাদার একটি অংশ বহন করে। এখন অভিযোগ উঠছে- দলটি ভারতপন্থী হয়ে যাচ্ছে। এ অভিযোগ সত্য কি-না তা অন্য বিষয়। কিন্তু মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হচ্ছে- এটিই বড় কথা। রাজনীতিতে পারসেপশন ইজ পলিসি। যদি মানুষ বিশ্বাস করে আপনি বদলে গেছেন, তাহলে আপনি বাস্তবে বদলেছেন কি-না তা আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
দলের পক্ষে কথা বলছেন যারা, তাদের বড় অংশের অতীত বিএনপির সাথে জড়িত নয়। কেউ বামরাজনীতির পটভূমি থেকে এসেছেন, কেউ ছিলেন সমালোচক, এমনকি কেউ কেউ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যাপারে অতীতে তির্যক প্রশ্ন তুলেছেন। আজ তারা হঠাৎ করে বিএনপির রক্ষক। এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়- এটি বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট তৈরি করে। কারণ রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে অবস্থান বদলানো গণমানুষকে সন্দিহান করে তোলে।
বিএনপির বহুল আলোচিত ৩১ দফা ছিল দলটির রাজনৈতিক রূপরেখা। সেখানে ছিল- সংবিধান সংস্কার, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে দলটি সেখান থেকে সরে যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, এটি ‘আওয়ামী চিন্তাধারার পুনরাবৃত্তি’। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে বিএনপি নিজের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য হারাচ্ছে। আর যদি এটি ভুল ধারণা হয়, তাহলে সেটি পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হচ্ছে দলটি। দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি।
সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিমের বিরুদ্ধে মামলা ও সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একজন অ্যাক্টিভিস্ট, যিনি অতীতে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন, তাকে আবার জেলে যেতে হচ্ছে। এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ? যদি একটি সরকার সমালোচনাকে হুমকি হিসেবে দেখে, তাহলে সেটি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ সমালোচনা বন্ধ করলে ভুলও ধরা পড়ে না।
এ মুহূর্তে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় দু’টি সঙ্কট স্পষ্ট : ১. দক্ষ সিভিলিয়ান পিআর টিমের অভাব; ২. সম্ভাব্য মিত্রদের দ্রুত বিরোধীতে পরিণত করা। এই দুই সমস্যা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সরকারের বার্তা অসঙ্গত। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য আসছে। কোনো কেন্দ্রীয় মেসেজিং নেই। ডিজিটাল যুগে পিআর মানে শুধু প্রেসব্রিফিং নয়। এটি ২৪/৭ অপারেশন। ভুল হলে সাথে সাথে ব্যাখ্যা দিতে হয়। ভুল অস্বীকার করা যায় না- স্বীকার করতে হয়।
দক্ষ পিআর টিম কী করে? ভুল আগে থেকে শনাক্ত করে, ড্যামেজ কন্ট্রোল করে, প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা দেয়, প্রয়োজনে নিঃশর্ত ক্ষমা চায়। এ প্রক্রিয়া আস্থা তৈরি করে।
বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া অনুপস্থিত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময় আমরা দেখেছি, যখন সিভিলিয়ান পিআর ব্যর্থ হয়, তখন সেই জায়গা দখল করে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। এটি একটি পরিচিত প্যাটার্ন। তখন কী হয়? প্রথমত, সমালোচনা দমন করা হয়। মামলা, গ্রেফতার, নজরদারি- এসব বাড়ে। দ্বিতীয়ত, প্রোপাগান্ডা শুরু হয়। বেনামি পেজ, ভুয়া তথ্য, পাল্টা অপপ্রচার। সমস্যা হলো- এ পদ্ধতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে না। কারণ ভয় দিয়ে আস্থা তৈরি করা যায় না।
ডিস-ইনফরমেশনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি সরকার নিজে অস্পষ্ট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে, তাহলে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো কমে যায়। তথ্যবিশ্লেষকদের ভাষায়- ‘ফলসহুড ক্যান নট ডিফিট ফলসহুড, অনলি ক্রেডিবিলিটি ক্যান।’ বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে সত্যও মানুষ বিশ্বাস করে না।
একসময় আওয়ামী লীগের পক্ষে মিডিয়া স্বেচ্ছায় কাজ করেছে। দলটির ন্যারেটিভ ছিল শক্তিশালী। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়ে যায়। শেষদিকে আওয়ামী সরকার নিরাপত্তা সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফল- আরো দ্রুত পতন। বিএনপি কি সেই একই পথে হাঁটছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সাধারণত তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন- ১. ন্যারেটিভ কন্ট্রোল : আপনি নিজের গল্প নিজে বলবেন, অন্যকে বলতে দেবেন না। ২. ক্রেডিবিলিটি : একবার হারালে ফিরে পাওয়া কঠিন। ৩. ইনক্লুশন : সমালোচকদের শত্রু না বানিয়ে, আলোচনার অংশ করা। মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্টদের মতে- ‘ডিজিটাল পলিটিক্স ইজ নট অ্যাবাউট সাইলেন্সিং ভয়েসেস, ইট ইজ অ্যাবাউট উইনিং ট্রাস্ট।’
বিএনপির ভেতরে একটি বড় সমস্যা- দলকে ‘ওন’ করার চেয়ে ‘ইউজ’ করার প্রবণতা। যারা সুযোগ পেলে অবস্থান বদলায়, তারা সঙ্কটের সময় ভরসা দেয় না। এ ধরনের মানুষ পিআর তো দূরের কথা, যুক্তি দিয়েও দলকে রক্ষা করতে পারে না।
বিএনপি এখন ক্ষমতায়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এখনো ‘পরীক্ষার মধ্যে’। প্রথম দুই মাসে যে সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। ক্ষমতা টিকে থাকে শুধু প্রশাসনিক শক্তিতে নয়- জন-আস্থায়। আর জন-আস্থা তৈরি হয় তিনটি জিনিসে- স্বচ্ছতা, সামঞ্জস্য ও সততা। এ তিন ছাড়া কোনো সরকার টেকে না।
প্রশ্ন এখন একটিই- বিএনপি কি এ বাস্তবতা বুঝবে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে?
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



