বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় পক্ষের সুবিধা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে
রাজধানীর শাহবাগ থানায় গত বৃহস্পতিবার ডাকসুর নেতাকর্মীদের ওপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় সারা দেশের ছাত্ররাজনীতি আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সরকারদলীয় ও বিরোধী ঘরানার ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছিল। এর মধ্যেই শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসু নেতা, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২৩ এপ্রিল রাতে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ ওঠে, শিবির-সংশ্লিষ্ট একটি আইডি থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছড়ানো হয়। তবে অভিযুক্ত পক্ষ দাবি করে, পোস্টটি ভুয়া বা বিকৃত। পরবর্তীতে বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং সূত্রে জানা যায়, ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নয়। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের পেইজ থেকে কিছু কনটেন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি ও বিকৃত প্রচার করা হয়েছে। সেটি এডিট করে সংশ্লষ্টি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফটোকার্ড বানানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পক্ষ শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে পরিস্থিতি উৎতপ্ত হয়।
সংঘর্ষের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল ডাকসু নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা। ডাকসুর দুই নেতা এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। পাশাপাশি ১০ জন সাংবাদিক থানার ভেতরেই হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকদের দাবি, তারা সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে বাধার সম্মুখীন হন এবং পরে সংগঠিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম এই ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই সংঘর্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটির বেশি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, যার বড় অংশ ফেসবুকনির্ভর। ফলে একটি ভুয়া পোস্ট বা বিকৃত তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এই ঘটনাতেও দেখা গেছে, একটি পোস্ট থেকেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। উভয় পক্ষই অভিযোগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
শাহবাগের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়েছে।
নেপথ্যের কারণ নিয়ে সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, ভুয়া পোস্ট ও গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, সংঘর্ষের সময় সংগঠিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে হামলার অভিযোগ ঘটনাটিকে আংশিক পরিকল্পিত বলে ইঙ্গিত করে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করে তৃতীয় পক্ষ বৃহত্তর সুবিধা নেয়ার প্রবণতা কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকি মনে করেন, পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরির মাধ্যমে ছাত্রসংগঠনগুলোকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে, যা ছাত্ররাজনীতিকে দুর্বল করে তুলছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সরাসরি কোনো পক্ষ দৃশ্যমানভাবে লাভবান না হলেও পরোক্ষভাবে কয়েকটি গোষ্ঠী সুবিধা পাচ্ছে।
প্রথমত, সাবেক ক্ষমতাসীন ঘরানার ছাত্ররাজনীতি, বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ এই অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে পারে। ধারাবাহিক সংঘর্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে বর্তমান বিরোধী ঘরানার সংগঠনগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা বাড়তে পারে। সেই শূন্যতায় নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তথাকথিত তৃতীয় পক্ষ বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলা এখন একটি সাধারণ কৌশল হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, উগ্র মতাদর্শী গোষ্ঠীগুলোর জন্যও এমন পরিস্থিতি অনুকূল হতে পারে। মূলধারার ছাত্ররাজনীতি দুর্বল হলে বিকল্প মতাদর্শ ছড়ানোর সুযোগ বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ দিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে অনিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে, যা ছাত্ররাজনীতির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক এই পরিস্থিতিকে আংশিক প্রশাসনিক ব্যর্থতার সাথেও যুক্ত করছেন। নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, সময়মতো নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। বলা যায় শাহবাগের এই সংঘর্ষ একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব কত দ্রুত বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে পারে এবং ছাত্ররাজনীতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এবং তথ্যভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই উত্তেজনা আরো বড় সঙ্কটে রূপ নিতে পারে।



