- বছরের পর বছর চলছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ
- জমি অধিগ্রহণে জটিলতায় বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত
- মেগা প্রকল্পে খরচ ৫ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে
হামিদুল ইসলাম সরকার
ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো প্রকল্পই সমাপ্ত হয় না। প্রকল্পের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এবং মেগা প্রকল্পসহ সব প্রকল্পেরই খরচ বাড়ে। অনেক প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ও সময়সীমা পরে কয়েক দফা বাড়ানো হয়। বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সমীক্ষা ছাড়াই অনুমাননির্র্ভর ব্যয়ে প্রকল্প তৈরি, দুর্বল পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণে ও ক্রয় পরিকল্পনায় জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি, দফায় দফায় প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন এবং রেট সিডিউল প্রতি বছর পরিবর্তনের কারণেই এই খরচ বৃদ্ধি পায়। প্রকল্পের খরচ দেখা যায় ২০ গুণও বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় এবং দফায় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক খরচ করতে হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ পাশর্^বর্তী অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। মূলত প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার লাফিয়ে বাড়ে বলে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
পনের বছরে এডিপির আকার ৮ গুণের বেশি
আইএমইডির তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের মতার ১৫ বছরে এডিপির আকার ৮ গুণের বেশি বেড়েছে, যা ৮২৯. ৮২ শতাংশ। মূলত পনের বছরে আকার বেড়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত ২০০৯ সালে মতায় আসার পরের অর্থবছরে (২০০৯-১০) সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি নিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরপর প্রতি বছরই এডিপির আকার বেড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কিভাবে ব্যয় বাড়ানো হয়
সরকারি প্রকল্পের ব্যয় সাধারণত কয়েকটি ধাপে বৃদ্ধি পায়। প্রথমত, মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় অনেক েেত্র বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় না। ৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রকল্প করার শর্ত হলো সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। সেটা বেশির ভাগ প্রকল্পে করা হয় না। ফলে অনুমান নির্ভর ব্যয়ে প্রকল্প তৈরি করে সেটা উপস্থাপন করা হয়। লক্ষ্য থাকে প্রকল্পটি কোনোভাবে আগে পাশ করানো। ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় তা দায়সারা। পরে কাজ শুরু হলে দেখা যায়, নির্মাণসামগ্রী, শ্রম ও প্রযুক্তি ব্যয় আগের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের মাঝপথে নকশা বা পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হলে নতুন করে খরচ যুক্ত হয়। বছর পেরুলেই কাজের রেট সিডিউলের পরিবর্তনে আবার খরচ বাড়ে। তৃতীয়ত, দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময় বাড়ে এবং সময় বাড়লে সুদ, রণাবেণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ বা পরামর্শক ব্যয়ও তালমিলিয়ে বাড়ে।
আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর ব্যয় ১৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি
সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়, বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ শেষ করতে খরচ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ২০ গুণ বা ১৯৭.১৩ শতাংশ। যে সেতুটি আট বছরে নির্মাণ করে চালু করার কথা ছিল, সেটি নির্মাণ করতে ১৬ বছর সময় পার করতে হয়েছে। যেখানে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার টাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার খরচ অনুমোদন দেয় ২০০৭ সালে, সেটির ব্যয় মোট ১৯৭.১৩ শতাংশ বা ২০ হাজার ৩১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শুধু সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা।
মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পে বেড়েছে ৫২.২৫ শতাংশ
প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, গত ২০১২ সালে প্রথম অনুমোদনের সময় মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। পরে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে একই বছরই প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে ২৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে লাইনটি মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অতিরিক্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণ, স্টেশন প্লাজা নির্মাণ, ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক সংশোধনের কারণে ২০২২ সালে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেয় একনেক। তখন প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেশি ব্যয় ধরা হয়। তবে সর্বশেষ সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২৫ সালে পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপিত তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ৪৪.১০ শতাংশ বৃদ্ধি
মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে ২টি ৬০০ মেগাওয়াটের মোট ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট (প্রথম সংশোধন) ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট একনেক থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্প ঋণসহ মোট ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি সমাপ্ত করার সময় ছিল ২০২৩ সালের জুনে। পরে এটার খরচ ১৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। ফলে ব্যয় বেড়েছে ৪৪.১০ শতাংশ। মেয়াদ আরো সাড়ে ৩ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পে জাইকা থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। সিপিজিসিএল প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। একযুগ এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ব্যয় বৃদ্ধি আরো ত্বরান্বিত হয়। অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে অদতা, দুর্নীতি কিংবা অতিরিক্ত দরপত্র মূল্যও ব্যয় বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। ফলে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। প্রকল্প শুরুর আগে বাস্তবসম্মত সমীা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, দ তদারকি এবং নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি একটা বড় জায়গা যেখানে সাশ্রয়ী হওয়ার অনেক সুযোগ আছে। ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি দিতে হবে। এটা এমন তো কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। কিন্তু দিতে হবে কেন? দিতে হবে এটা আমাকে দেখানোর জন্য। আমি দিয়েছি। বাস্তবায়ন করতে পারলাম কি পারলাম না, ওটা পরে দেখা যাবে। কিন্তু ওই ধরনের পথে হাঁটলে হয় কি আপনার নীতিটা এবং পুরা বাজেটটাই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
আর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধির ব্যাপারে বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমরা বলেছি কেন প্রকল্পের ব্যয় বা খরচ বৃদ্ধি পায়। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী আমরা দেখেছি ৬টি কারণে প্রকল্পের খরচ বেড়ে যায়। এগুলো হলো, দুর্বল ও অবাস্তব ডিপিডি প্রণয়ন।
অর্থাৎ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির ক্ষেত্রে আগে যে সম্ভাব্যতা যাচাই করার যে বিধান রয়েছে সেটা সঠিকভাবে করা হয় না। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার অভাব। এর মানে প্রকল্পের পরিচালক ঘন ঘন পরিবর্তন। প্রকল্পে ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করা হয়, অমীমাংসিত নিরীা আপত্তি এবং বছরের শুরুতে ধীর ব্যয়।



