ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সংক্ষেপে আইআরজিসির স্থলবাহিনীর সাবেক কর্নেল শাহবাজী এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে নয়া দিগন্তকে বলেছেন, পারমাণবিক বোমাকে হারাম হিসেবে ঘোষণা করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনি, ইরানে যিনি রাহবার বা নেতা নামে পরিচিত। এই ফতোয়ার কারণে তেহরান এ জাতীয় বোমা তৈরি করছে না। কিন্তু এ হারাম ফতোয়াকে প্রত্যাহার করা হলে, বোমা বানানোর জন্য খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়বে না।
শাহবাজী আরো বলেন, ইহুদিবাদী ইসরাইল ইরানে বিনা ঘোষণায় এবং উসকানিতে আগ্রাসী হামলা চালানোয় বিরাজমান মতভেদ মিটে গেছে। সবাই এখন আগ্রাসন মোকাবেলায় সরকারের সাথে একজোট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সরকার তার সাধ্য মতো মানুষের জন্য কাজ করতে আগের থেকেও বেশি উৎসাহের সাথে তৎপর হয়ে উঠেছে।
তেহরানের পার্শ্ববর্তী ঐতিহাসিক নগরী শাহরে রে থেকে তিনি এ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য অসাধারণ সহায়তা করেছেন তেহরানের ব্যবসায়ী জাভেদ শিরাজি। তার সহায়তা ছাড়া এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
নয়া দিগন্ত : ইহুদিবাদী ইসরাইলের হঠাৎ হামলার মুখে বিশ্ব দেখতে পেল যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাসহ কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী শহীদ হলেন। এটা কি করে সম্ভব হলো?
শাহবাজী : জি। ইরান সে সময় পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আমেরিকার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। শান্তি আলোচনা চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে এমনটি মনে করা হয়নি। এ ছাড়া কিছু অনুপ্রবেশকারী বিশ্বাসঘাতক বা মির্জাফর পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছে তারই ফলে এমনটি ঘটেছে।
নয়া দিগন্ত : ইরান সরকার বেশ শক্তিশালী এবং সক্ষম তারপরও এমন ঘটনা সত্যিই বিস্ময়কর।
শাহবাজী : এর পেছনে কারো কারো দায়িত্বজ্ঞানহীনতাও রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার আগে, ইসরাইলের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান চালিয়ে ইরান ব্যাপক গোয়েন্দা এবং স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিল।
নয়া দিগন্ত : তারচেয়ে বিস্ময়কর হলো ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইরান ঘুরে দাঁড়ায় এবং জবাবি হামলা শুরু করে। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল?
শাহবাজী : ইরান এক বিশাল দেশ। ইরান তার সব ডিম এক ঝুঁড়িতে রাখেনি। পুরো দেশে সব কিছু ছড়িয়ে রয়েছে। ইরানের তুলনায় ইসরাইল আকারে মাত্র ০.৬ শতাংশ।
নয়া দিগন্ত : এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের কি কি অর্জন করেছে বলে আপনি মনে করেন?
শাহবাজী : ইসরাইল গাজায় গত ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে হামলা চালাচ্ছে। সেখানে শান্তির কোনো কথাই আসছে না। কোনো যুদ্ধবিরতিও নেই। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করার পর আটদিনেই ইসরাইল এমন মারাত্মক ধ্বংসের মুখে পড়ে যে তেলআবিব যুদ্ধ বিরতি মানতে বাধ্য হয়। ইরানের জবাবি হামলা ছিল ইসরাইলের জন্য অতিমারাত্মক। ইরানের হামলার মুখে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রিটিশবাহিনী ইসরাইলকে তাক করে ছোঁড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার কাজে তৎপর ছিল। তারপরও ইসরাইলকে এই দশায় পড়তে হয়।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধের পরে ইরানের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কী কী পার্থক্য নজরে পড়ছে?
শাহবাজী : যুদ্ধের আগে ইরানের মানুষের মধ্যে মতভেদ ছিল, তাদের অনেক অভিযোগ অনুযোগ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর সব ভেদাভেদ দূর হয়ে গেছে ইরানের জনগণ ও সরকার এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই যুদ্ধ ইরানের জনগণ ও সরকারের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করেছে। সরকার ইরানের মানুষকে সহায়তা করার জন্য সর্বোত্তম তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জনগণ সরকারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইরানের পড়শি দেশগুলো, সৌদি আরব, কাতার, আমিরাতসহ অন্যান্য সবাই ইরানের প্রতি আস্থাশীল হয়েছে। অতীতে ইরানের প্রতি তাদের মনোভাব তেমন সন্তোষজনক ছিল না। কিন্তু এখন আরব দেশগুলো খুব শান্তভাবে এবং চুপচাপ ইরানের প্রতি নিজেদের সমর্থনের কথা প্রকাশ করছে।
এমনকি ইসরাইলের আচরণে ইউরোপের গণমানুষও খুশি নয়। ব্রিটেন, স্পেন, জার্মানি, ইতালি এমনকি নরওয়ের মানুষদের বেলায় এ কথা খাটে। তবে এ সব দেশের সরকারগুলো ইসরাইলকে সমথর্ন করছে। তেলআবিব যুদ্ধে ভয়ঙ্কর ক্ষতির মুখে পড়ায় ইউরোপের গণমানুষও ব্যাপকভাবে খুশি হয়েছে। তারা তাদের এই খুশিকে অনেক সময়ই খোলাখুলি ভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছে।
নয়া দিগন্ত : ইরান একাধিকবার বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এখন প্রশ্ন হলো- ইরান কি ধরনের ইঙ্গিত পেয়েছে বা কোন যুক্তির বলে এমন দাবি করছে?
শাহবাজী : ইসরাইল কখনোই কোনো আইনের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা দেখায়নি। ইসরাইলকে মোটেও বিশ্বাস করা যায় না।
নয়া দিগন্ত : ইরানের হাতে ইসরাইল ভালো রকম মার খেয়েছে। এ দশায় তাদের আবার ইরানে হামলা করার সাহস কোথা থেকে হবে?
শাহবাজী : ইসরাইল ভালো ভাবে মার খেয়েছে। এখন তেলআবিব আহত সাপের মতো হিংস্র হয়ে উঠেছে। সাপের মতো আবার হামলা করতে চাইবে ইসরাইল। ইরানের বিরুদ্ধে আট দিনের লড়াইতে ইসরাইল ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরাইলের পুরো ইতিহাসে এ রকম মারাত্মক ক্ষতির কোনো নজির নেই।
নয়া দিগন্ত : ইসরাইল যদি সত্যিই আবার হামলা করতে চায় কবে এ ধরনের হামলা করতে পারে?
শাহবাজী : এটা আসলে অনুমান করা সম্ভব নয়। ইসরাইলের যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকে তবে দ্বিতীয়বার হামলা করা উচিত হবে না। কিন্তু ইসরাইল হয়তো যুদ্ধবাজ মাথা গরম, কোনো যুক্তিতর্কের ধার ধারে না। ইসরাইলে এ জাতীয় মানুষের সংখ্যাই বেশি। তারাই ক্ষমতায় রয়েছে। ইসরাইলের ৭০ বা ৭৫ বছরের ইতিহাসে এমন পরাজয়ের মুখে পড়েনি। কাজেই ইসরাইল আবার হামলা করবে। ইসরাইল এবং আমেরিকায় কারা ক্ষমতায় রয়েছে তাদের ওপর এ হামলার বিষয় নির্ভর করছে।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধের পর ইরানের জীবন যাত্রা কেমন চলছে?
শাহবাজী : কেউ ভাবেনি ইরানের জনগণ সরকারের সমর্থনে চলে যাবে। এখন জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
নয়া দিগন্ত : আপনি একজন সৈনিক। আইআরজিসিতে ছিলেন। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি না করে ভুল করেছে বলে কি আপনার মনে হয়?
শাহবাজী : ধর্মীয় কারণে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রয়েছে। আমাদের রাহবারে মোয়াজ্জেম পারমাণবিক বোমা বানানো বা মজুদ রাখাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তাই আমাদের কাছে পারমাণবিক বোমা নেই। আর আজই যদি আমাদের পারমাণবিক বোমা বানানোর আদেশ দেয়া হয় তাহলে আমরা বোমা বানানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ব। বোমা বানানোর ফতোয়া যদি আমাদের নেতা দেন তা হলে খুবই দ্রুত, খুবই দ্রুত পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে পারব। এর কারণ হলো- বোমা বানানোর মতো সব উপকরণ ইরানের কাছে রয়েছে। বোমা বানাতে হলে যা করতে হবে, এ সব উপকরণের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে হবে। অতীতেও আমাদের নেতা নিষেধ করেছেন তাই বোমা তৈরি করা যায়নি। ওটাই ছিল একমাত্র বাধা। রাহবারে মোয়াজ্জম হারাম ঘোষণা করায় বোমা বানানো হয়নি। উনি যদি এখনই হুকুম দেন, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বোমা তৈরির কাজ শেষ করে ফেলা যাবে।
তিনি সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে বলেন, দৃঢ় এবং শক্তভাবে দাঁড়ালেই কেবল নিরাপদে থাকা যায়। বাংলাদেশের মানুষ যেন নিরাপদে থাকে সেই কামনা করেন তিনি।



