হাফেজ মাওলানা মুহাম্মাদ আজিজুল হক
জুমার দিনের নামকরণ : ‘জুমা’ অর্থ একত্রিত হওয়া। এ দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ একত্রিত হবে, অথবা শুক্রবারে যেহেতু মুসলমানরা জোহরের নামাজের পরিবর্তে মসজিদে একত্রিত হয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন, তাই এ দিনটিকে জুমার দিন বলা হয়। (গুনিয়াতুত তালেবিন)
জুমার দিন বিশেষ নিয়ামত : আল্লাহ তায়ালা আগের জাতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তোমরা সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিনে আমার জন্য বিশেষ একটি ইবাদত করো। কিন্তু তারা সেই শ্রেষ্ঠতম দিনটি নির্ণয় করতে ভুল করেছে। চিন্তা-ভাবনা করে ইহুদিরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য শনিবারকে নির্বাচন করেছে, আর নাছারারা নির্ধারণ করেছে রোববারকে। অথচ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত দিন হলো জুমার দিন। এ দিনের অনেক ফজিলত, অনেক বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘আমরা পরে আগমনকারীরাই কিয়ামতের দিন অগ্রগামী হবো। অথচ অন্যদের আসমানি কিতাব দেয়া হয়েছে আমাদের আগে। জুমার দিন তাদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা এতে মতবিরোধ করেছে। আর আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক দিনটির পথ দেখিয়েছেন।’ (বুখারি-৮৭৬)
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয় জুমার দিন হলো সমস্ত দিনের সর্দার। জুমার দিন আল্লাহর কাছে মহান দিবস। এমনকি এই দিন আল্লাহর কাছে ইসলামের দুই ঈদের দিন থেকেও মহান। এ দিনে আল্লাহ তায়ালা আদমকে সৃষ্টি করেছেন। জান্নাতে দাখিল করেছেন। এদিন তাঁকে দুনিয়াতে নামানো হয়েছে। তাঁর তাওবা কবুল হয়েছে। এদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।’
জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময় : জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যে মুহূর্তে বান্দা আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি তা অবশ্যই কবুল করেন। সে সময় নির্ধারণে বিভিন্ন মতামত থাকলেও শাহ ওয়ালি উল্লাহ রহ. দু’টি সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন- ১. ইমাম খুতবা দেয়ার জন্য যখন মিম্বারে ওঠেন তখন থেকে জুমার নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত। ২. জুমার দিন আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অধিকাংশ আলেম দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
জুমার রাতে আমল পেশ করা হয় : রাসূল সা: বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অর্থাৎ জুমার রাতে বান্দাদের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যতীত বাকিদের আমল কবুল করা হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ-১০২৭২)
ইয়াওমুল মাজিদে জান্নাতিদের সমাবেশ : জান্নাতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত আল্লাহর দিদার বা দর্শন লাভ। প্রতি জুমার দিন আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে মাজিদ নামক ময়দানে জান্নাতিদের দর্শন লাভে ধন্য করার জন্য সমাবেশ ঘটাবেন। রাসূল সা: বলেন, ‘আমাকে জিবরাইল আ: বলেছেন, জান্নাতে আল্লাহ তায়ালা প্রশস্ত ও সুগন্ধময় একটি উপত্যকা বানিয়েছেন এবং এতে তিনি শুভ্র মেশকের একাধিক টিলা স্থাপন করেছেন। জুমার দিনে আল্লাহ এই উপত্যকায় অবতরণ করবেন। তখন সেখানে নবীদের জন্য স্বর্ণের মিম্বর, আর শহীদদের জন্য মুক্তার চেয়ার রাখা হবে। সেদিন হুরেরা নিজ নিজ কক্ষ থেকে অবতরণ করবেন। এরপর আল্লাহ ঘোষণা করবেন- ‘হে ফেরেশতারা। আমার বান্দাদের বিশেষ পোশাক পরিধান করাও, উন্নত খাবার ও পানীয় পরিবেশন করো এবং আতর-খোশবু লাগিয়ে দাও।’ এরপর এমন সব নিয়ামতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন যা কখনো কোনো চোখ দেখেনি এবং কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি। এবার আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন- ‘তোমরা আর কি চাও?’ বান্দারা আল্লাহর সাক্ষাৎ চাইবে। তখন আল্লাহ পর্দা উঠিয়ে দিবেন। দুনিয়াতে যেমন সব মানুষ বিনা বাধায় সব জায়গা থেকে স্পষ্টভাবে চাঁদ-সূর্য দেখতে পায় তেমনি জান্নাতিরাও কোনো ধরনের অসুবিধা ছাড়াই আল্লাহকে স্পষ্ট দেখতে পাবেন। জান্নাতবাসী অনুভব করবেন আল্লাহর দিদারের চেয়ে উত্তম কোনো নিয়ামত নেই। (তাবারানি-২১০৫৪)
জুমার দিনের আমল ও ফজিলত : জুমার ফজিলত-সংক্রান্ত হাদিসগুলো পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়, এই দিনের বিশেষ আমল হচ্ছে- ১. উত্তমরূপে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করা; ২. নিজের সুন্দর জামাটি পরিধান করা; ৩. খোশবু ব্যবহার করা; ৪. সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া; ৫. হেঁটে মসজিদে যাওয়া; ৬. মসজিদে অন্য মুসল্লিকে ডিঙ্গিয়ে সামনের কাতারে না যাওয়া; ৭. দুজন বসা ব্যক্তির মাঝে কষ্ট দিয়ে না বসা; ৮. অনর্থক কোনো কিছু না করা; বরং সাধ্যমতো সুন্নাত-নফল পড়া; ৯. খুতবা চলাকালে কোনো কথা না বলে একাগ্রচিত্তে খুতবা শুনা এবং ১০. গুরুত্বের সাথে জুমার নামাজ আদায় করা। এ ১০টি আমল করলে আল্লাহপাক তার ১০ দিনের গুনাহ মাফ করবেন এবং প্রত্যেক কদমে এক বছর নফল নামাজ এবং এক বছর নফল রোজার সাওয়াব দান করবেন।’ (মুসলিম-৮৫৭, মুস্তাদরাকে হাকেম-১০৪৬৫)
১১ নম্বর আমল : সপ্তাহের ঈদের দিন হলো শুক্রবার। এদিনে নখ কাটা, মোচ ছাঁটা, বগল পরিষ্কার করা, নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা, মোটকথা- পুরো শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা মুস্তাহাব। মহানবী সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে নখ কাটবে, আল্লাহ তাকে অপর জুমা পর্যন্ত বালা-মুসিবত থেকে হিফাজত করবেন এবং নেক হায়াত দান করবেন।’
১২ নম্বর আমল : রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে কিয়ামতের দিন তার জন্য এমন একটি নূর হবে, যা তার থেকে আকাশের মেঘমালা অথবা কাবা পর্যন্ত আলোকিত করবে এবং দুই জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ মাফ হবে।’ (মিশকাত-২১৭৫)
১৩ নম্বর আমল : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন আসরের নামাজের পর নিজ নিজ স্থান থেকে উঠার আগে এবং কোনো কথা বলার আগে ৮০ বার এই দরুদ পাঠ করে ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি, ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাল্লিমা তাসলিমা’ তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হবে এবং ৮০ বছরের সাওয়াব লাভ হবে।’ (আফজালুস সালাওয়াত-২৬)
লেখক : কলামিস্ট, খতিব ও মাদরাসা শিক্ষক



