দৈনিক ৪০ টাকা মজুরিতে নকলনবিস পদে যেসব কর্মচারী ভূমি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন তাদের হাতেই প্রতি মাসে কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এ ছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির প্রচলন শুরু হলেও বিভিন্ন ফাঁক ফোঁকরে এখনো এনালগ পদ্ধতিতেই চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতি। গত কয়েক দিনে রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুরে ও খোঁজখবর নিয়ে যে তথ্য মিলেছে তাতে দেখা গেছে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্ট্রার তাদের অধিনস্ত নকলনবিসদের যোগসাজশে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যদিও ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্র জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রতিটি সাব রেজিস্ট্রার অফিস সরকারি আদেশেই অডিটের আওতায় থাকে। তারপরেও যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ দিকে গত কয়েক দিনে ঢাকার বিভিন্ন সাবরেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসেই নকলনবিসদের দৌরাত্ম্যের কারণে খোদ সাবরেজিস্ট্রারই যেন অসহায় অবস্থায় থাকেন। যদিও দৈনিক ৪০ টাকা (বালাম বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠার) মজুরীর এই নকলনবিসদের (মাস্টার রুলে নিয়োজিত) মাধ্যমেই অবৈধ উপায়ে উপার্জনের সুযোগ নেন সাব রেজিস্ট্রারগণ নিজেরাও। কোনো কোনো অফিসে নকলনবিসদের দৌড়াত্ম্য এতটাই বেশি যে অন্যান্য সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই থাকেন তটস্থ অবস্থায়। খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসেও এমন কয়েকজন নকলনবিস রয়েছেন যারা জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসকেও সর্বদা নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। সূত্র আরো জানায়, ঢাকা জেলার ২১টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দালাল চক্র এতটাই সক্রিয় রয়েছে যে, তারা সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাকে জিম্মি করে নিয়মিত প্রতিটি দলিল অনুপাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।
নকলনবিসদের দৌরাত্ম্য
নকলনবিসদের একটি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানান, ঢাকার মোহাম্মদপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রধান হোতা হচ্ছেন নকলনবিস আওলাদ হোসেন। তিনিই মূলত এখানকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। সূত্র জানায় এই অফিসের সাবরেজিস্ট্রার আবদুল কাদেরের আশীর্বাদপুষ্ট আওলাদ হোসেন প্রতি মাসে একটি বড় অঙ্কের মাসোহারা সাবরেজিস্ট্রারকে সরবরাহ করে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই না করেই অর্থের বিনিময়ে দলিল সম্পাদন করার কাজে আওলাদ হোসেনকে নিয়োজিত করা হয়েছে। আবার ঘুষ না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র বা টিআইএনসংক্রান্ত নিয়মও অনেক সময় মানা হয় না বলে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিগত আওয়ামী লীগের আমলে এমন অনেক অভিযোগ থাকলেও কারো পক্ষেই কোনো প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও আগের সেই চিত্র কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। আগের মতোই সব অন্যায় এবং অপরাধ এসব অফিসে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এমন অভিযোগে আওয়ামী সরকারের সময় দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ থাকার কারণে কয়েক মাস আগে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অহিদূর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজিস্ট্রেশন অফিসে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট, ডিজিটাল মনিটরিং এবং দালালমুক্ত সেবা চালু জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের হয়রানির শেষ হবে না।
রাজস্ব ফাঁকির কৌশল
রাজধানীর বেশ কয়েকজন নকলনবিস এবং জমির দলিল লেখকের সাথে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে আলাপ-চারিতায় জানা গেছে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিনব নানা কৌশল। বিশেষ করে সাবরেজিস্ট্রার তার খেয়াল খুশিমতো নানা কৌশলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজের আখের গোছাতে সব সময়ই ব্যস্ত থাকেন। প্রথমত জমি রেজিস্ট্রেশনে কয়েকটি খাত উপ-খাতে সরকার রাজস্ব পেয়ে থাকে। এরমধ্যে এফএফ-৫৩ খাতে (ব্যক্তি পর্যায় থেকে আদায়যোগ্য রাজস্ব) ভ্যাট আদায় করা হয় শতকরা ৫ টাকা এবং এর উপরে আরোপিত ট্যাক্স ধার্য করার সুযোগ রয়েছে শতকরা ২ টাকা। এই দুই খাত মিলিয়ে মোট আদায়যোগ্য ভ্যাট ৭%। তবে এই ৭% ভ্যাট আবাসিক জমির উপরে প্রযোজ্য নয়। এই ভ্যাট শুধু বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত জমির উপরেই ধার্য করার বিধান রয়েছে। এখানে সাব রেজিস্ট্রারের এখতিয়ার না থাকলেও তিনি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত জমিকে কৌশলে অথবা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েই আবাসিক জমি হিসেবে রেজিস্ট্রি করে মোটা অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে জমির ক্রেতা বা বিক্রেতা কিঙ্কু জানতে বুঝতে পারেন না। কারণ এই টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা না নিয়ে অধিকাংশ সাব রেজিস্ট্রার নগদেই গ্রহণ করেন। তবে জমির এই রকম পরিবর্তনের বিষয়টি দলিলের বালাম বইয়ে সংরক্ষিত থাকে। এটা শুধু দলিল লেখক এবং নকলনবিসদের কাছেই গোপন রাখতে পারলেই বড় অঙ্কের টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা না হয়ে পুরো টাকাই চলে যাবে সাবরেজিস্ট্রারের পকেটে কিংবা সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু টাকা যাবে দলিল লেখক কিংবা নকলনবিসের হাতে।
সাবকবলা দলিলেও চতুরতা
সাধারণভাবে সাবকবলা দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রেও ক্রেতা এবং বিক্রেতাকে বোকা বানিয়ে বড় অঙ্কে হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ পায় সাবরেজিস্ট্রাররা। যদিও ডিজিটাল/ অনলাইন পরচা চালু হওয়ার পর সরাসরি কোনো জমির মৌজা বা জমির ধরন পরিবর্তন করার সুযোগ কমে গেছে। তবে ডিজিটাল পদ্ধতির মধ্যেও এনালগ কৌশল করেই মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে সাবরেজিস্ট্রার অফিসে। যেমন- একটি সাবকবলা দলিল করার সময়ে পরচায় জমির ধরন বা রকমে বাড়ি লেখা থাকলেও সেখানে জমিতে যদি কোনো স্থাপনা থাকে তাহলে ঐ জমির মৌজা রেট বা জমির রকমের নির্ধারিত দামের উপরেই বাড়তি হারে ভ্যাট/ট্যাক্স সরকারের রাজস্ব খাতে জমির মালিককে জমা দিতে হয়। এখন কৌশলে বাড়ি লেখা জমিতে স্থাপনাবিহীন দেখিয়ে কম রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা দিয়ে বাড়তি আদায়কৃত টাকা সাবরেজিস্ট্রার নিজেই হস্তগত করতে পারেন। একইভাবে জমির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেয়ার চুক্তিপত্রেও বড় অঙ্কের টাকা এ দিকে সে দিক হতে পারে। বতর্মানে জমির রকমের কলামে কৃষি, অকৃষি, বাড়ি, নাল, বাইদ বাঁশঝাড়, শাইল জমি জলাশয় নানা নামে জমির শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। এর একেকটি জমির রেজিস্ট্রি মূল্যও আলাদা আলাদা।
সেরেস্তা ফি আদায়
জমির রেজিস্ট্রেশনে নানাভাবে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকার পরেও সাবরেজিস্ট্রারগণ নিজেদের জন্য হালাল উপার্জনের অন্যতম একটি খাত থাকে সেরেস্তা ফি আদায়। এটি অনেকটা তাদের ভাষায় বৈধ উপার্জনের মতো। যদিও এই সেরেস্তা ফি নির্ধারিত হার শূন্য দশমিক এক শতাংশ। তবে এর অনেক বেশি অর্থও তারা নিজেদের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছেন। এটা সম্ভব হয় দলিল লেখকদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমেই। আবার বণ্টননামা দলিল সম্পাদনের সময়েও সরকার নির্ধারিত টাকার অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসেই দেখা যায়।
অডিট মানেই বাড়তি ইনকাম
সরকারের নির্দেশনা মতেই প্রতি ছয় মাস পরপর প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল কার্যক্রম, বালাম বই এবং নকলনবিসদের কাজের তদারকির জন্য জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে টিম গঠন করে অডিট পরিচালনার কথা। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এখন নিয়ম হয়েছে অডিট মানেই অর্থের লেনদেন। অবশ্য এজন্য প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অঘোষিত একটি রেটও নির্ধারণ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রারের নিয়ন্ত্রণে মোট ২১ টি সাব রেজিস্ট্র অফিস পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি তিন মান পরপর অডিটের নাম করে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসঙ্গতি ধামাচাপা দেয়ার জন্যই বড় একটি অঙ্কের টাকা লেনদেন হচ্ছে।
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদকের কাছে অফিসিয়ালি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জমির পরচা কপি অনলাইন হওয়ার পর অনেক অনিয়ম কমে গেছে। অন্য দিকে আশার কথা হচ্ছে জমির দলিল সম্পাদনের জন্য অনলাইন সিস্টেম চালু করার একটি প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। কিছু কাজও এগিয়েছে। এই প্রকল্পটি গত তিন মাস আগে নেয়া হয়েছে। কয়েক দিন আগে প্রকল্পের পিডি পরিবর্তন হওয়ার কারণে কাজের গতিতে শ্লথ হয়েছে। তবে এখন থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হচ্ছে। দলিলের কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে শুরু হলে ক্রেতা বিক্রেতা কাউকেই আর অফিসে সশরীরে আসতে হবে না। অনলাইনে সব কাগজপত্র আপলোড দেয়া হলে দলিলের কাজও সহজে এবং দুর্ভোগ ছাড়াই সম্পাদন হয়ে যাবে।



