গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলার বিচার শেষ হতে কেটে গেছে দুই যুগের কাছাকাছি সময়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া কন্যাসন্তানের বয়স এখন ২১ বছর- তারও বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ মামলার এখনো হয়নি নিষ্পত্তি। বারবার পিছিয়ে যাওয়া যুক্তিতর্ক, আদালতে শুনানি না হওয়া এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বাদিপক্ষ।
গতকাল রোববার গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বহু প্রতীক্ষিত ১১তম ধার্য তারিখে যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীর অসুস্থতার দরখাস্তের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি গ্রহণ না করেই বিচারক এ কে এম নাসির উদ্দিন এজলাস ত্যাগ করেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
এ সময় আদালতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মামলার বাদি রিকশাচালক ইদ্রিস আলী, তার ধর্ষিতা মেয়ে ফাতেমা এবং ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া কন্যা লিমা (২১)। একপর্যায়ে তারা চিৎকার-চেঁচামেচি ও হট্টগোল শুরু করলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি শান্ত করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাদি ইদ্রিস আলী বলেন, “টাকার কাছে কি সবাই বিক্রি হয়ে যাবে? আমি গরিব মানুষ, রিকশা চালাই, তাই বলে কি আমরা বিচার পাবো না? আমার মেয়ের ইজ্জত গেছে, সেই ঘটনার ফলে জন্ম নেয়া নাতনীকে ২১ বছর ধরে কষ্ট করে মানুষ করেছি। এখনো কি তার কোনো স্বীকৃতি ও বিচার মিলবে না?”
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যখন এই আদালতের বিচারক ছিলেন, তখন এই মামলা দায়ের করেছিলাম। এরপর ১০ জন বিচারক বদলি হয়েছেন; কিন্তু বিচার শেষ হয়নি।’
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২১ জুন টঙ্গী মডেল থানায় মামলা নং-২১ দায়ের করেন বাদি ইদ্রিস আলী। মামলায় তার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাড়িওয়ালার ছেলে রুহুল আমীনকে এবং পরবর্তীতে গর্ভপাত ঘটানোর চেষ্টার অভিযোগে বাড়িওয়ালা রুহুলের বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নূরুন্নাহারকে আসামি করা হয়।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় রেকর্ডকৃত জবানবন্দীতে উঠে আসে- বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভিকটিমকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ এবং পরবর্তীতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে গর্ভপাত করানোর চেষ্টা করা হয়।
ভিকটিমের মা আনোয়ারা বেগম জবানবন্দীতে বলেন, অভিযুক্ত রুহুল আমিন তার মেয়েকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে এবং পরে তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, অভিযুক্তের পরিবার প্রথমে সন্তান নষ্ট করার পর বিয়ে দেয়ার কথা বলেছিল।
অপর সাক্ষী তার জবানবন্দীতে জানান, তিনি ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে অবগত হন এবং পরে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সময়ও উপস্থিত ছিলেন।
এ দিকে থানা পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর ধর্ষণের অভিযোগে আসামি রুহুল আমীনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুনঃতদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুর। ডিএনএ পরীক্ষাসহ পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পিবিআই তিন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মামলাটি যুক্তিতর্কের জন্য রাখা হয়। এরপর রোববারসহ মোট ১১ বার যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য হলেও বিভিন্ন অজুহাতে শুনানি হয়নি বলে বাদিপক্ষ অভিযোগ করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তাহের নয়ন বলেন, ‘আমরাও চাই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু বিচারকের আন্তরিকতা না থাকলে আমাদের করার খুব বেশি কিছু থাকে না।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি; কিন্তু বাদিপক্ষ আজ আমাকেই ভুল বুঝছে। অথচ, আমি বেশি দিন হয়নি দায়িত্ব নিয়েছি। যারা আগে ছিলেন তারা কী করেছেন?
আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের নভেম্বরে বর্তমান বিচারক এ কে এম নাসির উদ্দিন এ আদালতে যোগদান করেন। তাদের দাবি, যোগদানের পর থেকে মামলাজট কমার গতি সন্তোষজনক নয়। বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, তারা সকাল থেকে আদালতে উপস্থিত থাকলেও বিচারক প্রায়ই দুপুরের পর এজলাসে ওঠেন এবং স্বল্পসময় আদালত পরিচালনা করেন।
ধর্ষণের অভিযোগে জন্ম নেয়া সন্তান এখন প্রাপ্তবয়স্ক। জীবনের দুই দশকের বেশি সময় আদালতের বারান্দায় কাটিয়ে বাদিপক্ষের প্রশ্ন, ‘আর কত বছর অপেক্ষা করলে বিচার মিলবে ?’



