স্ক্রিনের আলোয় ডুবন্ত প্রজন্ম মো: তায়ীম খান

Printed Edition
স্ক্রিনের আলোয় ডুবন্ত প্রজন্ম
মো: তায়ীম খান
স্ক্রিনের আলোয় ডুবন্ত প্রজন্ম মো: তায়ীম খান

রাত ৩টা। শহর যখন নিস্তব্ধ, তখন লাখ লাখ তরুণের বালিশের পাশে জ্বলছে স্মার্টফোনের নীল আলো। কেউ বিরামহীন ‘স্ক্রোল’ করছে ছোট ভিডিওর গোলকধাঁধায়, কেউ অন্যের সুসজ্জিত জীবনের কৃত্রিমতায় খুঁজছে নিজের অপূর্ণতা। এটি কেবল একটি প্রজন্মের অনিদ্রার গল্প নয়; একটি দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ও জাতীয় উৎপাদনশীলতার সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি।

অ্যাটেনশন ইকোনমি ও ডোপামিন লুপ : অর্থনীতির ভাষায় বর্তমানে আমরা বাস করছি ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতিতে। বড় বড় টেক জায়ান্টদের কাছে ব্যবহারকারীর প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। তাদের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। প্রতিটি লাইক বা নোটিফিকেশন আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়, যা কালক্রমে আসক্তিতে পরিণত হয়। আমরা যখন নিজের হাতখরচের টাকা দিয়ে এমবি কিনে এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করছি, তখন মূলত আমরা গ্রাহক নই; বরং আমাদের ‘সময়’ ও ‘মনোযোগ’ই হলো তাদের বিক্রয়যোগ্য পণ্য।

সুযোগ ব্যয়, হারানো মেধা : অর্থনীতির একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যদি এই আসক্তিকে বিশ্লেষণ করি, তবে এর ‘সুযোগ ব্যয়’ আঁতকে ওঠার মতো। একজন তরুণ যদি দিনে গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় স্ক্রোলিংয়ে ব্যয় করে, তবে জীবনের একটি বড় অংশ সৃজনশীল কাজ বা দক্ষতা উন্নয়ন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আমি যখন আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করি তাদের প্রতিদিন ফোন ব্যবহার সময় কতটুকু? তাদের গড় সময় ৯-১০ ঘণ্টা। এখন কথা হচ্ছে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ৭-৮ ঘণ্টা সামাজিক মিডিয়াতে যুক্ত থাকে। বিটিআরসির তথ্য মতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি বিশাল অংশ তরুণ। এই বিশাল জনশক্তির কয়েক বিলিয়ন শ্রমঘণ্টা যখন স্রেফ বিনোদনের নামে নষ্ট হয়, তখন জাতীয় উৎপাদনশীলতায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

সামাজিক তুলনা ও হীনম্মন্যতা : সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড হলো বাস্তব জীবনের একটি ‘সম্পাদিত’ সংস্করণ। সেখানে কেবল উজ্জ্বল সাফল্য আর নিখুঁত মুহূর্তগুলোরই স্থান হয়। তরুণরা যখন অন্যের এই কৃত্রিম জীবনের সাথে নিজের অগোছালো বাস্তবের তুলনা করে, তখন জন্ম নেয় হীনম্মন্যতা। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটায়, তাদের মধ্যে একাকিত্ব ও বিষণœতার হার তুলনামূলক বেশি। এই ‘তুলনার সংস্কৃতি’ এখন এক নীরব মহামারীর রূপ নিয়েছে।

সাইবার বুলিং ও নিরাপত্তা ঝুঁকি : অনলাইনে একটি বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ স্রেফ কিছু শব্দ নয়; এটি বাস্তব আঘাতের মতোই গভীর ক্ষত তৈরি করে। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় এই নিরাপত্তাহীনতার দায় রাষ্ট্র ও সমাজ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

মস্তিষ্কের বিপর্যয় ও শারীরিক প্রভাব : স্মার্টফোনের নীল আলো আমাদের ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণে বাধা দেয়। ফলে গভীর ঘুমের অভাব ঘটে, যা সরাসরি আমাদের মেধা, সৃজনশীলতা এবং মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। ক্লাসে মনোযোগের অভাব বা দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই ডিজিটাল অতিনির্ভরতা।

উত্তরণের পথ ও সচেতনতা : প্রযুক্তি বর্জন সমাধান নয়, বরং এর ‘নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার’ বা ‘ডিজিটাল হাইজিন’ বজায় রাখা জরুরি। ১. ডিজিটাল লিটারেসি : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার শেখাতে হবে। ২. স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ : স্মার্টফোনের ‘অ্যাপ লিমিট’ ফিচার ব্যবহার করে ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করা। ৩. পারিবারিক বন্ধন : ভার্চুয়াল জগত থেকে বেরিয়ে পরিবারের সাথে গুণগত সময় কাটানো এবং আউটডোর কার্যকলাপে যুক্ত হওয়া।হ