বগুড়া অফিস
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছেড়ে দেয়া বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে নানা শঙ্কার মধ্যেই ভোট গ্রহণ আজ। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ১৫০টি কেন্দ্রে ভোটাররা ভোট দেবেন। উপনির্বাচনে জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা (ধানের শীষ), জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বগুড়া শহর আমির অধ্যক্ষ মো: আবিদুর রহমান সোহেল (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) মো: আল-আমিন (ফুলকপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আবিদুর রহমান সোহেল ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট পেয়েছিলেন। উপনির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের দু’জনই স্থানীয় নেতা হওয়ায় দু’জনের মধ্যে জমজমাট লড়াই হতে পারে বলে ভোটারদের ধারণা। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার বাহিনী।
শেষ মুহূর্তে দুই মূলপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে এলাকায় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন গতকাল বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল। তিনি অভিযোগ করেন, রিটার্নিং অফিসার নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। লিখিতভাবে একাধিকবার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলেও তিনি তা আমলে নেননি। তিনি একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন। বার বার নিরপেক্ষ লোকদের প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনের সকল কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো সত্ত্বেও তিনি সরকারি দলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রিজাইডিং অফিসারসহ সকল নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ১৫০টি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারের তালিকা প্রদানের দাবি প্রায় ১০ দিন আগে করা হলেও রিটার্নিং অফিসার তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আমরা বিভিন্নভাবে প্রিজাইডিং অফিসারদের তথ্য পেয়ে এরমধ্যে ১৬ জনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে প্রমাণকসহ রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দাখিল করি। রিটার্নিং অফিসারের এহেন অস্বচ্ছ এবং দলীয় পদধারী লোকদের নির্বাচনে নিয়োগদানের জন্য তীব্র নিন্দা এবং সকল প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত এমন দলীয় লোকদেরকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার দাবি জানাচ্ছি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে ধানের শীষের পক্ষে মিছিল করার প্রতিবাদ জানিয়ে আবিদুর রহমান বলেন, মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের সরকারি চিকিৎসক, নার্স , কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও তারা যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় লিপ্ত হন, তা সরকারি চাকরি-শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। এ ছাড়াও আমরা জানতে পেরেছি যে, বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামে গ্রামে আমাদের নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ হুমকিসহ নানা ভাবে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘিœত করার চেষ্টা চলছে।
অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যারা নেকাব পরে ভোটকেন্দ্রে যাবেন তারা নেকাব খুলে তারপর ভোট দিতে পারবেন।
বিএনপি প্রার্থীর এই বক্তব্য প্রচারের সাথে সাথে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শহরের বিপুল সংখ্যক নেকাব পরা নারী বগুড়ার সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা জেলা নির্বাচন অফিসার ও উপনির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের ক্ষোভের কথা জানান এবং ভোটকেন্দ্রে নেকাবধারী ও হিজাবধারী নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। রিটার্নিং অফিসার নারীদের কথা শুনে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নারী ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। নারী ভোটারদের নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিয়ে নির্বিঘেœ বাসায় ফেরার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন করবে বলেও তিনি আশ^স্ত করেন।
বিক্ষুব্ধ নারীরা বিএনপি প্রার্থীর বক্তব্য প্রত্যাহার এবং তার বিচার দাবি করেন। এরপর তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা কর্তৃক নেকাববিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট বিচার দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, বগুড়া-৬ সদর আসনের মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩০৯ জন। পুরুষ ২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, নারী ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৭৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ১০ জন। পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনের কেন্দ্র ১৫০টি এবং মোট বুথের সংখ্যা ৮৩৫টি। ৫৩টি ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। এর মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্রকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) সূত্রে জানা গেছে, মোট কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৯৭টি সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো হলো- বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের পুরাতন (উচ্চ মাধ্যমিক) ভবনের পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্র, ভাণ্ডারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং বগুড়া করোনেশন ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্র। এসব অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের প্রতিটিতে ৬ জন করে পুলিশ সদস্য এবং ১৫ থেকে ১৬ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ৫ জন করে পুলিশ এবং ১২ থেকে ১৫ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে থাকবেন। দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আট প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল থেকে তারা দায়িত্ব পালন শুরু করছেন এবং আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করবেন। বগুড়া সদর উপজেলার তিনটি বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে বিজিবি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। শুক্রবার থেকে তারা সক্রিয়ভাবে টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু করেছেন। এ ছাড়াও ৮ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ৯ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত ট্রাক, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর পাশাপাশি ৭ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ১০ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ফজলুল করিম বলেন, নির্বাচনকালীন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং পরবর্তী সময় এই তিন পর্যায়েই বিজিবি সদস্যরা টহলসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।



