ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদ ব্যক্তি থেকে রাজনীতি

প্রধান টার্গেট নারীরা রাজনৈতিক স্বার্থেও কারসাজি

বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক ব্ল্যাকমেইলিং এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আদায়, মানহানি কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকিতে থাকলেও সাম্প্র্রতিক সময়ে এর বিস্তার রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্ষমতার বলয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক ব্ল্যাকমেইলিং এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আদায়, মানহানি কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকিতে থাকলেও সাম্প্র্রতিক সময়ে এর বিস্তার রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্ষমতার বলয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

রাজনৈতিক ও ক্যাম্পাস প্রেক্ষাপট : নতুন মাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল কারসাজি এখন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পরিবার বা শীর্ষ নেতাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড, বিকৃত ভিডিও বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব কনটেন্ট অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বিব্রত করা বা জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত মানহানির বিষয় নয়; বরং ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’ ও ‘সাইকোলজিক্যাল অপারেশন’-এর অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে তরুণদের মধ্যে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা সহজ।

কৌশল ও প্রযুক্তি : ডিপফেক থেকে ফেক ন্যারেটিভ

অপরাধীরা এখন আর শুধু হ্যাকিং বা ছবি চুরি করেই থেমে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও তৈরি, ভয়েস ক্লোনিং, এমনকি সম্পূর্ণ ভুয়া কথোপকথন তৈরি করে তা বাস্তব বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে একজন সাধারণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা- কেউই নিরাপদ থাকছেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সাম্প্রতিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি ভুয়া ফটোকার্ড বা ভিডিও প্রথমে ছোট একটি গ্রুপে ছড়ানো হয়, পরে তা বিভিন্ন পেজ ও আইডির মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসবের পেছনে সংগঠিত চক্র কাজ করে, যারা একই সাথে একাধিক আইডি পরিচালনা করে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ তৈরি করে।

অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ : দ্বিমুখী আঘাত

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের বড় অংশই অর্থ আদায়ের সাথে যুক্ত। তবে রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্ল্যাকমেইলের ক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকে চরিত্র হনন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা। ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা ও ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না, ফলে অপরাধীরা আরো সাহসী হয়ে ওঠেন।

আইন ও বাস্তবতা : বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের পাশাপাশি নতুন ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল ও অনুমতি ছাড়া কনটেন্ট ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান থাকায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবে কার্যকর প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পৃথক সাইবার ইউনিটের সম্প্রসারণ।

করণীয় : ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সমস্যার সমাধান কেবল আইন দিয়ে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন- ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি; বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি শিক্ষা; রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সাইবার মনিটরিং। এ চারটি স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। ডিজিটাল স্পেস এখন নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে। এখানে তথ্য যেমন শক্তি, তেমনি অপতথ্যও অস্ত্র। এ বাস্তবতায় ব্ল্যাকমেইল, অপপ্রচার ও ডিজিটাল কারসাজি রোধে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

আইনি প্রতিকার ও প্রতিরোধের পথ

প্রথম পর্বে ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিস্তার, কৌশল ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণের পর এবার প্রশ্ন- ভুক্তভোগীর সামনে আইনি পথ কতটা কার্যকর এবং কিভাবে তা ব্যবহার করা উচিত?

বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় একাধিক আইন থাকলেও সাম্প্রতিক ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ আইনের আওতায় অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রচার, ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের চেষ্টা- সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশেষ করে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে শাস্তি আরো কঠোর করা হয়েছে, যা আইনের প্রতিরোধমূলক দিককে শক্তিশালী করেছে।

আইনি প্রতিকার পেতে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো- প্রমাণ সংরক্ষণ। ভুক্তভোগীদের উচিত অপরাধীর মেসেজ, আইডি লিংক, লেনদেনের তথ্য, স্ক্রিনশট বা যেকোনো ডিজিটাল ট্রেইল সংরক্ষণ করা। কারণ সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে এ ডিজিটাল প্রমাণই তদন্তের ভিত্তি।

পরবর্তী ধাপে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা বা সরাসরি সাইবার ইউনিটে অভিযোগ দেয়া জরুরি। ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার সাপোর্ট সেন্টার, ডিবির সাইবার ইউনিট বা সিআইডির বিশেষ শাখা এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করে দ্রুত তদন্ত শুরু করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও অভিযোগ জমা দেয়ার সুযোগ রয়েছে, যা ভুক্তভোগীদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করেছে।

তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া বা হয়রানির আশঙ্কায় অভিযোগ করতে চান না। আবার অনেক মামলায় প্রযুক্তিগত জটিলতা ও প্রমাণের অভাবে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। ফলে আইনের কার্যকারিতা অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনকে কার্যকর করতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি- প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত তদন্ত ও বিচারের নিশ্চয়তা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশ তৈরি। বিশেষ করে নারী ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সবশেষে আইনি প্রতিকার কেবল শাস্তির বিষয় নয়- এটি একটি বার্তা। অপরাধীকে জানিয়ে দেয়া যে ডিজিটাল স্পেসও আইনের বাইরে নয়। আর ভুক্তভোগীর জন্য এটি একটি শক্তি- নীরব থাকার বদলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি।