সাইফুল মাহমুদ ময়মনসিংহ অফিস
ময়মনসিংহ নগরীতে সন্ধ্যার আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করে নজির সৃষ্টি করেছে সিটি করপোরেশন। ঈদের দিন মাত্র ছয় ঘণ্টায় সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত হয়েছে নগরী। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করে প্রশংসা কুড়িয়েছে সিটি করপোরেশন (মসিক)। স্বল্প সময়ে দ্রুত ও সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মাধ্যমে ঈদের দিনই নগরীর সড়ক, অলিগলিসহ বিভিন্ন এলাকা পরিচ্ছন্ন হওয়ায় স্বস্তিতে ছিলেন নগরবাসী।
প্রতি বছরের মতো এবারো ঈদুল আজহা উপলক্ষে নগরীতে অসংখ্য পশু কোরবানি দিয়েছেন নগরবাসী। বেশির ভাগ পশু কুরবানি করা হয়েছে রাস্তায়। এসব পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন নগরবাসীকে যথাস্থানে বর্জ্য ফেলার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করা হবে। বিকেল ৩টায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করতে ৮০০ পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে নিয়োজিত করেন তিনি। কিন্তু সিটি প্রশাসককে ফোনে ঈদের দিন সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিকেল ৫টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনা পেয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন বিকেল ৩টার পরিবর্তে দুপুর ১২টায় বর্জ্য অপসারণে মাঠে নেমে যান। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে তিনি সরেজমিনে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও সড়কে উপস্থিত থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম তদারকি ও অংশগ্রহণ করেন। এ সময় নগরবাসীর স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও প্রদান করেন তিনি। সিটি প্রশাসকের সরাসরি তদারকিতে সন্ধ্যার আগেই বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। কোরবানি বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করায় দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণ হয়নি নগরীর। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছেন নগরবাসী। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আগের তুলনায় এবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার পরিবেশ অনেক ভালো হয়েছে। আগে বর্জ্য পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াত। এবার ঈদের দিনই বর্জ্য পরিষ্কার করায় নগরবাসী বেশ স্বস্তিতে ছিল।
নগরবাসীর মতে, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে সাহেব কোয়ার্টার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্ক। ঈদ উপলক্ষে সিটি করপোরেশন ‘পরিচ্ছন্ন পার্ক, সুন্দর নগরী’ এই প্রত্যয়ে নগরীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র জয়নুল আবেদিন পার্কেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে। পার্কের ঝরা পাতা, আবর্জনা অপসারণ ও ঘাস ছাঁটাইয়ের কাজ করেছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ঈদের ছুটিতে নগরবাসী ও দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে পার্কটিকে পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন রাখতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। যার প্রশংসা করেছেন পার্কে আসা পর্যটকগণ। শুধু তা-ই নয়, ময়মনসিংহ নগরীর চামড়া গুদাম এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া প্রধান সড়কে রাখার কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে সিটি প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ ও যানজট নিরসন করেন। গত দু’দিন সরেজমিন নগরীর ব্রিজ মোড়, গাঙ্গিনাপাড়, নতুনবাজার, জিলা স্কুল মোড়, কলেজ রোড, চরপাড়া, মাসকান্দা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ আরো বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়ে কোরবানির পশুর কোনো ময়লা ও রক্তের দাগ দেখা যায়নি।
নগরীর সানকিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোস্তাক আহমেদ জানান, বিগত বছরগুলোতে ঈদের দুই-তিন দিন পরও নগরীর অলিগলিতে কোরবানির বর্জ্য পড়ে থাকত, বাতাসে ছড়াত তীব্র দুর্গন্ধ। বৃষ্টি হলে পশুর রক্ত আর ময়লা পানি মাড়িয়ে চলতে হতো। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঈদের দিন বিকেলের মধ্যেই পুরো এলাকা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কোথাও কোনো ময়লার স্তূপ কিংবা দুর্গন্ধের বালাই নেই। সন্ধ্যার আগেই নগরীর বর্জ্যমুক্ত করার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। টাউন হলো এলাকার বাসিন্দা জহির রায়হান বলেন, ‘এবারের ঈদে সিটি করপোরেশনের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সিটি প্রশাসক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করেছেন। দ্রুত বর্জ্য সরানোর কারণে এবার দুর্গন্ধহীন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঈদ উপভোগ করতে পেরেছি।’
মসিক প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যে ঈদের আগেই কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। নগরীর ঘরে ঘরে পলিথিন ব্যাগ ও ব্লিচিং পাউডার সরবরাহের পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে তিনি নিজেই মাঠে থেকে বর্জ্য অপসারণ করেছেন। নিজের উপস্থিতির কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা উৎসাহভরে কোরবানির দেড় শতাধিক টন বর্জ্য অপসারণে কাজ করায় নির্ধারিত সময়ের আগেই নগরী বর্জ্যমুক্ত করা সম্ভব হয়।’ মসিক প্রশাসক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রত্যেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে কাজে উৎসাহিত করতে পাঁচ হাজার টাকা করে ঈদ বোনাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই উপহার পেয়ে কর্মীরা আন্তরিকতার সাথে দ্রুততম সময়ে নগরী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।’ তিনি জানান, নগরীর সব পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানকে পরিচ্ছন্ন রাখতেও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীরা নিয়মিত কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে নগরবাসীকেও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পশুর হাটগুলোও ঈদের দিন ফজরের নামাজের পরপরই পানি ও ময়লার গাড়ি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঘরে ঘরে পলিব্যাগ ও ব্লিচিং পাউডার পৌঁছে দেয়ায় নগরবাসীও সচেতনভাবে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য রেখে করপোরেশনকে সহযোগিতা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো: সবুজ বলেন, ‘ঈদের দিনে সবাই যখন আনন্দ করে, আমরা তখন ময়লা টানি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের পাঁচ হাজার টাকা ঈদ বোনাস দেয়ায় আমরা উৎসাহিত হয়েছি। প্রশাসকের নির্দেশ মতো বিকেলের মধ্যেই নগরী পরিষ্কার করে দিয়েছি।’ আরেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাসেল মিয়া বলেন, ‘বোনাসের টাকা পাওয়ায় আমাদের পরিবারেও ঈদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়েছিল। সন্ধ্যার আগেই ময়মনসিংহের রাস্তাঘাট ও ড্রেন বর্জ্যমুক্ত করতে পেরে আমাদের খুব ভালো লাগছে।’



