ওয়াশিংটন-তেহরান সংলাপে অচলাবস্থা ইউরেনিয়াম নিয়ে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

তেহরানের হাতে থাকা ইউরেনিয়ামের পরিণতি কী হবে, সেই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। গতকাল শুক্রবার ভারতের নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট, ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আছেন আরাকচি। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনায় ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে আলোচনা বন্ধ থাকার তথ্য দিয়ে আরাকচি বলেন, ‘বিষয়টি এই মুহূর্তে আলোচনায় নেই। তবে আলোচনার পরবর্তী ধাপে আমরা এ বিষয়ে ফিরে আসব।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা যায় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ইরান শান্তি আলোচনায় আবার তখনই বসবে, যখন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সিরিয়াস’ মনে হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।

এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান। জর্দান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা। এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে। যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই দেশ। সেই দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালী ঘিরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। মাঝে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চললেও এখনো দু’পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়নি।

এদিকে ইরান ইস্যুতে ধৈর্য হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকের পর ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ শোয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বেইজিংয়ের শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ ঘটছে। চীন ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দেশটির তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও ওয়াশিংটন এখনো ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। আলোচনা চললেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি। ফলে আলোচনা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি আর বেশি ধৈর্য ধরব না। তাদের একটা চুক্তিতে আসতে হবে।’ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুদ হস্তান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনসংযোগের জন্য এটা খুব জরুরি নয়, তবে আমাদের হাতে থাকলে স্বস্তি পাব।’ ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে ‘ধ্বংস’ বা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে দেয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আল জাজিরা জানায়, ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান, ইরানকে হয় একটি চুক্তিতে আসতে হবে, অন্যথায় তারা ধ্বংসের শিকার হবে। তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার এই বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠোর বাগাড়ম্বর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান সম্প্রতি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তিনি বলেন, ইরান ভূগর্ভ থেকে কিছু মিসাইল বের করেছে এবং এগুলো মাত্র এক দিনের মধ্যেই ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। তবে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি কিছুটা মিশ্র মূল্যায়ন দিয়েছেন। ট্রাম্প মনে করেন, দেশটির বর্তমান কর্মকর্তারা আগের পর্যায়ের নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি বিচক্ষণ এবং যৌক্তিক। তার মতে, ইরানের আলোচনা করার ধরনেও এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

বৈঠকের পর হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, শি জিনপিং হরমুজ প্রণালীর সামরিকীকরণ এবং সেখানে কোনো ধরনের টোল আদায়ের বিরোধিতা করেছেন। তিনি ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, সে বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে একমত হয়েছেন। চীন ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি তেল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, শি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। তাই যুদ্ধ বন্ধ করতে চীনের সহায়তা চাইছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীন ইরানের ওপর খুব বেশি চাপ দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বেইজিং থেকে সিএনবিসিকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চীন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কারণ এটা তাদের নিজেদের স্বার্থেও জড়িত।

আবুধাবি তেহরানের সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে : কাজেম ঘারিবাবাদি

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কড়া সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে ইরানে সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সহযোগিতা ও সুবিধা দেয়ার অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় আবুধাবি তেহরানের সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে। সেই সাথে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলা ব্রিকস সম্মেলনে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর করা দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, ইরান তাদের দেশে হামলা ও আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছে। এ নিয়ে কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থন ও সহজ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালের জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, যে দেশগুলো আগ্রাসনকারীদের সুযোগ-সুবিধা ও পরিষেবা দেয়, তারা কেবল তাদের সহযোগিতাই করে না; বরং নিজেরাই আগ্রাসন চালায়।

এ সময় তিনি আরব আমিরাতকে একটি আগ্রাসী দেশ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, হামলা শুরুর আগেই ইরান আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যদি তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে তাদের ভূখণ্ড ও স্থাপনাগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়, তবে তেহরান তার আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে। আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর সব স্থাপনা বা এমন যেকোনো অবকাঠামো ও ঘাঁটি যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অংশ বা অংশগ্রহণ রয়েছে, সেগুলোতে হামলা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।

ঘারিবাবাদি বলেন, এটি যুদ্ধ ছিল এবং সেই যুদ্ধে আমরা ইরানকে রক্ষা করেছি। আরব আমিরাত নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। অথচ প্রকৃত ভুক্তভোগী হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান।

এর আগে ইরানের কর্মকর্তারা আরব আমিরাতকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুঁশিয়ারি দেন।