গাজায় ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা সম্প্রসারণ জোরদার

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ এলাকায় সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো জোরদারের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। আলজাজিরার ডিজিটাল অনুসন্ধান ইউনিটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্ল্যানেট ল্যাবস ও সেন্টিনেল হাবের স্যাটেলাইট ছবিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ে গাজায় ব্যাপক সামরিক নির্মাণকাজ চলেছে। একই সময়ে ধ্বংসস্তূূপ সরানো বা বেসামরিক পুনর্গঠন কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, গাজার উত্তরাঞ্চলের বেইত হানুন ও দক্ষিণের রাফাহে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ বন্ধ থাকলেও, ইসরাইলি বাহিনী সেখানে স্থায়ী সামরিক অবস্থান তৈরি করছে। ১০ মার্চের ছবিতে গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকার আল-মুনতার পাহাড়ে ব্যাপক পরিষ্কার ও প্রতিরক্ষা স্থাপনা নির্মাণ দেখা যায়। একইভাবে খান ইউনুস ও মধ্য গাজার বিভিন্ন স্থানে নতুন সামরিক আউটপোস্ট গড়ে তোলা হচ্ছে। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার কাছে খননকাজ ও মাটির বাঁধ তৈরির প্রমাণও মিলেছে। এ ছাড়া জুহোর আদ-দিক এলাকায় নতুন সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে পুরনো ও নতুন সামরিক ঘাঁটির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে, যা স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের শেষদিকে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের এক তদন্তে গাজায় ৪৮টি ইসরাইলি সামরিক স্থাপনার তথ্য উঠে আসে, যার মধ্যে ১৩টি তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর নির্মিত। এসব ঘাঁটিতে পাকা সড়ক, নজরদারি টাওয়ার এবং যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। এ দিকে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ‘নিউ রাফাহ’ নামে একটি আধুনিক নগর পরিকল্পনা তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এতে আকাশচুম্বী ভবন ও বিলাসবহুল অবকাঠামোর কল্পচিত্র দেখানো হয়। তবে জেনেভাভিত্তিক ইউরো-মেড মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা এই পরিকল্পনাকে ‘জনসংখ্যা পুনর্বিন্যাস’ ও ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি’র কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজাকে ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে সীমাবদ্ধ আবাসিক এলাকায় ফিলিস্তিনিদের রাখা হতে পারে, যা সমালোচকদের মতে ‘গেটো’ ব্যবস্থার মতো।

এ ছাড়াও গাজায় কথিত যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ধীরে ধীরে স্থায়ী সীমান্তে পরিণত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের বেইত লাহিয়ায় স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, এই লাইনের ভেতরে আরো কয়েকশ মিটার এলাকা দখল করে নতুন প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ইসরাইলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে এই লাইনকে ‘নতুন সীমান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ গাজা ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় সহিংসতা থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫০ জন নিহত ও দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে মোট নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে। এ দিকে, বিভিন্ন মানবিক সংস্থা জানিয়েছে, গাজায় পুনর্গঠন পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। একইসাথে স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

গাজায় হামলা ইসরাইলি অব্যাহত, নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়ছে

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে, এতে নতুন করে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, বিভিন্ন স্থানে হামলায় অন্তত দুইজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। উত্তর গাজার জাবালিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে গুলি চালালে একজন নিহত হন। মধ্য গাজার নুসেইরাত এলাকায় ড্রোন হামলায় আরেকজন প্রাণ হারান এবং কয়েকজন আহত হন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে জানা যায়। একই সময়ে খান ইউনুসসহ দক্ষিণাঞ্চলে গোলাবর্ষণ ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকাতেও নৌবাহিনীর হামলার খবর পাওয়া গেছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ ধরনের লঙ্ঘনে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। তাদের মতে, এখন পর্যন্ত হাজারের বেশি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ইতোমধ্যে গাজার অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রমাণ করছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং বেসামরিক জনগণ এখনো ঝুঁঁকির মধ্যে রয়েছে।

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ইসরাইলের ওপর চাপ বৃদ্ধির আহ্বান

গাজায় যুদ্ধবিরতির শর্ত পূরণে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। সংগঠনটি বলেছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের শর্ত বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী ধাপের আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

মিসরের রাজধানী কায়রোতে মধ্যস্থতাকারী দেশ ও ফিলিস্তিনি বিভিন্ন পক্ষের সাথে বৈঠকের পর হামাস এ আহ্বান জানায়। তাদের দাবি, চুক্তির অধীনে ইসরাইল যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করা হয়নি এবং প্রতিদিনই বিভিন্নভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করছে ইসরাইল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির লক্ষ্য ছিল সহিংসতা বন্ধ করা, গাজা থেকে দখলদার বাহিনী প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা। তবে হামাসের অভিযোগ, বাস্তবে অবরোধ, হামলা এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত রয়েছে। গাজার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর ছয় মাসে প্রায় ২,৪০০টি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে হামলা, গ্রেফতার এবং অবরোধ অন্তর্ভুক্ত। এতে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছে। হামাস জানিয়েছে, তারা আলোচনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছে, প্রথম ধাপের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়।

অস্ট্রেলিয়ায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিক্ষোভ

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীরা নতুন ‘ঘৃণাত্মক বক্তব্যবিরোধী আইনে’র বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। এই আইনের অধীনে নির্দিষ্ট কিছু স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিসবেনে রাজ্য পার্লামেন্টের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নেয়ার পর অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ স্লোগান ব্যবহার বা প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পরদিন আরো দুইজনকে একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।

বিক্ষোভকারীদের সংগঠন জানিয়েছে, আইনি পরামর্শ অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই জনস্বার্থে বক্তব্য দেয়ার অধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা আইন অনুযায়ী বৈধ হতে পারে। তাদের মতে, এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করছে।

অন্য দিকে, কুইন্সল্যান্ড সরকারের দাবি, এই আইন ইহুদি সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা এখন এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।