নেতিবাচক নয় ইতিবাচক

ইতিবাচক সম্মেলন চলার সময় দ্বিতীয় দিনেই একনেকে পাস হয়েছে এক হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কাস্টমস আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বীকার করতেই হয়েছে- পাঁচ দশকে কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর দক্ষতা উন্নয়নে কিছুই করা হয়নি। স্বীকার করা হয়েছে বহিঃসম্পদ (বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে তাদের প্রেসক্রিপশনে) নিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে শক্তিশালী করতে হয়েছে বা হচ্ছে। বানানো হবে ভবন, বলা হচ্ছে, বাড়বে দক্ষতা ও সক্ষমতা সেই ভবনের অধিকর্তাদের। নতুন করে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দায়িত্বশীলতা, ব্যবসাবাণিজ্যের পোষক নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাদের মনোভাবের পরিবর্তন বা উন্নয়ন প্রত্যাশা করা হয়েছে প্রকল্প দলিলে

বাজেট বানানোর মৌসুম চলছে। সংস্কার নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। গণতন্ত্রের আকিকা হচ্ছে হবে অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া চীন বিশ্ব ভাগাভাগির পুরনো খাসলতে ফিরছে, ঘরের পাশে ফিসফাস শোনা যাচ্ছে। ঠিক এ সময় বাংলাদেশীদের করণীয় কী, দায়িত্ব-কর্তব্য কী তা নির্ধারণ নিশ্চয়ন নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপে থাকার প্রশ্নটি সামনে আনতেই হচ্ছে। প্রথম দাওয়াই হচ্ছে নেতিবাচকতা থেকে ইতিবাচকতায় আসতে হবে। জাতি হিসেবে ঐকবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। সংস্কারের ব্যাপারে রাজনৈতিক দৃঢ়চিত্ততা প্রয়োজন হবে। কাজ শুধু শুরু করলে হবে না শেষ করতে হবে। চাই মনোভঙ্গির পরিবর্তন।

বাংলাদেশে বহুদিনের ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগ ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সমঝোতায়, সহমর্মী, সহযোগী দেশ অঞ্চল ও অর্থনীতির দিকপালেরা, বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ ব্যবসায় ও সহযোগিতা বাড়ানোর অপার সম্ভাবনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন, কিন্তু ওই পর্যন্তই , তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধরি মাছ না ছুঁই পানি ধরনের সমস্যার কথা, সমস্যা দূরীকরণের দাবি তুলেও তোলেন না, পরামর্শ ও সুপারিশ রেখেও রাখেন না। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগের মাথা যারা ছিলেন বা আছেন তারা এখনো প্রশংসায় ধন্য হতে চান, উচ্চকণ্ঠ হন নিজেদের এবং দেশের ইমেজ প্রচারের কাজে, ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে সাফল্য তুলে ধরতে। দেশের পোষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানরা মাঝে মধ্যে জেগে ওঠেন ‘সেবা’ ও ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর নানান সওগাত নিয়ে। কিন্তু বাস্তব ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশে সেবা ও পরিপোষণা প্রাপ্তি কতখানি এবং তাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আস্থাবান হতে পারছেন কি না, বাস্তবতায় পুষ্ট হয়েছেন বা হবেন কি না, সে দ্বিধা প্রকাশ করেন আভাসে ইঙ্গিতে। বোঝা যায়, এখন সবাই এমন একটি প্রচারযজ্ঞের এন্তেজাম যা মুখ্যত বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের ব্রান্ডিংকে, রোল মডেল হওয়ার ইমেজ তুলে ধরতে। প্রচার-প্রচারণা বাহুল্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আয়োজিত ইতিবাচক এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সম্মোহিত সমকালীন সমাজ, আমজনতা, পুঁজিহারা ব্যাংকের আমনতকারী, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী, পা পিছলানো মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিনে দিনে জমে ওঠা নানান সংশয়-সন্দেহ নিঃসৃত নেতিবাচকতা কেটে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

একই সাথে বর্তমানে দেশী ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জমে থাকা অভিযোগ, ক্ষোভ, কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বৃদ্ধির, মূল্যস্ফীতির দোষ, করোনা, ইউরোপের ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ওপর চাপানোর সুযোগসহ দেশ ও রাজনৈতিক অর্থনীতি অভ্যন্তরে নিজেদের নানান ব্যর্থতা ও ‘অপ’প্রয়াস থেকে দৃষ্টি সরানোর সুযোগ কি না সেটিও বুঝতে বলা যায়। বলা যেতে পারে, অপারগতার বেদনা চাপা দেয়া যায়, যাতে দ্বিধা কেটে যায়, উন্নয়নশীল দেশের ক্লাবে প্রবেশের পথে সংসয়-সন্দেহগুলো অবগুণ্ঠিত অপনোদিত থাকে। সে নিরিখেও নিঃসন্দেহে বর্তমানের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক। এই ইতিবাচকতা যেন নেতিবাচকতাকে ঠেকাতে সক্ষম হয়। যেন উচিত পরিবর্তন আসে দেশের অর্থনীতিতে, ব্যাংকিং খাতের সবলতা বৃদ্ধি পায়, স্বচ্ছতা জবাবদিহির চর্চা চলে। এটি বেশি প্রয়োজন সমাজ যখন পরস্পরবিরোধিতায় আকীর্ণ, ন্যায়নীতি-নির্ভরতার মূল্যবোধ যখন আইসিইউতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যথাযথভাবে মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়ানোর বা মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার প্রেসক্রিপশন ও পথ্য (শিক্ষা ব্যবস্থা) নির্মাণ ও রচনায় দারুণ দুর্গতি বিদ্যমান।

বলা বাহুল্য, বিদ্যমান অপঅবস্থা ব্যবস্থাকে ‘এনকোর’ ‘এনকোর’ (অনমোর অনমোর) করানোর প্রয়াস চলছে। উপলব্ধিতে আসছেই না সমাজ রাজনীতি অর্থনীতিকে নেতিবাচক হওয়ার উপাদান উৎপাটন হওয়া দরকার। তা নাহলে এই তথাকথিত ইতিবাচক হওয়া বা করার চেষ্টা নেতিবাচকতাকে উসকিয়ে দিতে পারে। বাইরের প্রশংসাপত্র আর কত দরকার? অতীতে এমন প্রশংসা বহুবার শোনা বা শোনানো হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ সে অর্থে তেমন আসেনি। কোটরা (কোরীয় ট্রেড ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি) গ্রিন গ্রোথ ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর ২০২৩ সালে বাংলাদেশে এফবিবিসসিআই আয়োজিত জিনসে সামিটে বলেছিলেন, যারা ভিয়েতনামে চায়নিজ রিলোকেশনের বাস (বা নৌকা) মিস করেছেন তারা এখন বাংলাদেশে আসতে পারেন। এ কথা আজকের নয়, বছর আটেক আগে থেকেই জানান দেয়া হচ্ছিল জাপানিদের চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে রিলোকেট করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিগত ১০ বছরে ভিয়েতনাম ও ভারত কী করে কী করতে পেরেছে তার বিপরীতে বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ (রিলোকেশন আকর্ষণে) নিতে পেরেছে বা নিয়েছে সেটির শুমার করলে বেরিয়ে আসবে চতুর, সচেতন, হিসেবি ও সক্রিয় বিনিয়োগকারীরা কেন উৎসাহী হননি বা আমরা তাদের আনতে পারিনি। বিগত এক দশকে আগের সময়গুলোর তুলনায় নিজ দেশে বিনিয়োগ না করে দেশের পুঁজি ও মেধা বা উদ্যোক্তা পাচার হয়েছে বিদেশে। বেড়েছে বহুগুণে। কঠিন শর্তের স্বল্পমেয়াদি সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট নেয়া হয়েছে আগের চার দশকের প্রায় সমপরিমাণ। দেশে যখন স্থানীয় বিনিয়োগের পরিবেশ পরিস্থিতির তথৈবচ অবস্থা, স্থানীয় বিনিয়োগ বস্তুত স্থবির, যখন দেশের পুঁজি ও মেধা পাচার হয়ে সেসব দেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি করে কেউ সেসব দেশের ধনীদের ক্লাবে ঢোকায় সফলও হয়েছেন, তখন বাইরের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পেটানো ঢোলে কেন উদ্বুদ্ধ হবে? দেশের পুঁজিবাজার যখন তলানিতে, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বরং পুঁজি প্রত্যাহার করেই চলেছে, ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ সিসিইউতে যাওয়ার পথে, যেসব খবর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অজানা নয়, সে সময় পুঁজিবাজার চাঙ্গা করার নামে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বিদেশে রোড-শো করায় ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতা একাকার হয়ে যায়। ১০০টি ইকোনমিক জোনকে সত্যিকার অর্থে শিল্প ও বিনিয়োগ হাব হয়ে ওঠার সুযোগ, উপযোগিতা, কমপিটিটিভনেস ও মনোযোগিতা মিরশ্বরাইতে সরকারি টাকায় ও খাসজমিতে বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। ১০০ ইকোনমিক জোন গড়ে ওঠার ব্যাপারে পরিষেবা, প্রণোদনা, ঘটা করে ঘোষিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস- সবকিছুকে যথাযথভাবে সংস্থান না করলে ইতিবাচক আবহ তৈরি হবে না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা মাঝপথে এসে বশংবদ সমস্যার কাদায় আটকিয়ে গেলে তারা হতোদ্যম ও নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন। ১৯৯৭ সালের এশিয়ান ক্রাইসিসের শানে নুজুল পুনর্পাঠের প্রয়োজন হবে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যমান ডেভেলপররা কেমন আছেন বা কেমন থাকবেন সে ব্যাপারে অগৌনে মনোযোগ না দিলে বিশাল ইতিবাচকতা নেতিবাচকতায় নুয়ে পড়বে। শুধু জমি জোগাড়েই মাঠপর্যায়ের (ভূমি) প্রশাসনের সেবা-সহযোগিতার নমুনা যাচাই করলে বোঝা যাবে- ডেভেলপররা কেমন আছেন, কেন তারা নির্মাণ প্রকল্প শেষ করতে পাছেন না। গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রাপ্তির পরিস্থিতি পরিসংখ্যান বড় করুণ। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পের ব্যয় আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। সুতরাং এই প্রচারসর্বস্ব মাহফিল আয়োজনে প্রশংসাবাক্য শোনাই শুধু সার হবে, বাস্তবতার বাসর তো দিল্লি দূর অস্ত। বিভিন্ন সম্মেলনে কি নোট স্পিকার এ বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেন, বলতে গেলে অনেকটা রিস্ক নিয়ে। আসলে আমাদের এখন লুক টু দ্য ইস্ট-ওয়েস্ট, নর্থ-সাউথ না করে লুক টু আওয়ার সেলভস (নিজের দিকে তাকাও) এ মনোনিবেশই হবে বরং ইতিবাচক অগ্রগতির, আবেগ অনুভূতির, প্রত্যাশা প্রাপ্তির সোপান। ইতিবাচক এবং নেতিবাচককে এক বিছানায় নেয়া কখনো সমীচীন ছিল না, হবেও না। অন্যের বিনিয়োগ ও রোল মডেল হওয়ার প্রশংসাপত্র পাওয়া কঠিন হবে না, দেশের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা শুধরিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে, এমনিতেই বিদেশী বিনিয়োগ আসার পথ সহজ হবে। তখন দেশের শিল্প উদ্যোক্তাকে দেশে রাখা যাবে, অর্থ ও মেধাপাচার বন্ধ হবে। বিদ্যমান সমস্যা এড়িয়ে, চেপে রেখে, ইতিবাচকতার ভান বা প্রত্যাশা করা হবে নেতিবাচকতার শামিল।

ইতিবাচক সম্মেলন চলার সময় দ্বিতীয় দিনেই একনেকে পাস হয়েছে এক হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কাস্টমস আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বীকার করতেই হয়েছে- পাঁচ দশকে কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর দক্ষতা উন্নয়নে কিছুই করা হয়নি। স্বীকার করা হয়েছে বহিঃসম্পদ (বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে তাদের প্রেসক্রিপশনে) নিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে শক্তিশালী করতে হয়েছে বা হচ্ছে। বানানো হবে ভবন, বলা হচ্ছে, বাড়বে দক্ষতা ও সক্ষমতা সেই ভবনের অধিকর্তাদের। নতুন করে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দায়িত্বশীলতা, ব্যবসাবাণিজ্যের পোষক নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাদের মনোভাবের পরিবর্তন বা উন্নয়ন প্রত্যাশা করা হয়েছে প্রকল্প দলিলে। বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভঙ্গি সীমাবদ্ধতা (যা বিজনেস সামিটে বারবার উচ্চারিত হয়েছে) কাটিয়ে শুল্ক বিভাগকে ইতিবাচক ধারায় আনতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, মন্ত্রতন্ত্র আইন-কানুন কই? পর্যাপ্ত বরাদ্দ কই, ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি দরকার হবে। এত দিনে গালভরা শব্দ মাধুর্যে মাখা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একাধিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন ফলাফল জবাবদিহির আওতায় না আনলে, অগ্রগতি মূল্যায়ন না করলে, হিসাব বুঝে না নিলে বর্তমান ও প্রস্তাবিত সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নেতিবাচকতাকে ইতিবাচক করা যাবে না। ইতিবাচকতার সুঘ্রাণ ও সমৃদ্বির স্বার্থে নেতিবাচকতার অবসান কামনা সবার।

লেখক : অনুচিন্তক