স্বার্থান্বেষী মহলের অর্থায়নে গড়ে উঠেছে অপতথ্যের সাম্রাজ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপফেককে পুঁজি করে বাংলাদেশে অপতথ্যের এক বিশাল সাম্রাজ্য বা ‘ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল এবং তাদের সমমনা দেশী-বিদেশী গোষ্ঠী এই প্রচারণার পেছনে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থায়ন করছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিদেশী কিছু স্বার্থান্বেষী মহল অর্থায়ন করছে। গত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত অপতথ্য ছড়ানোর জন্য দেশী ও বিদেশী চক্রের বিনিয়োগ এবং অর্থায়নের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে এই অর্থায়িত অপপ্রচারের অর্থনীতি এখন শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • ক্রিপ্টো ওয়ালেটে অর্থ আসছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে
  • বড় অঙ্কের অর্থায়ন করছে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল
  • লক্ষ্য রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ ও শান্তি বিনষ্টের চেষ্টা করা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপফেককে পুঁজি করে বাংলাদেশে অপতথ্যের এক বিশাল সাম্রাজ্য বা ‘ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল এবং তাদের সমমনা দেশী-বিদেশী গোষ্ঠী এই প্রচারণার পেছনে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থায়ন করছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিদেশী কিছু স্বার্থান্বেষী মহল অর্থায়ন করছে। গত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত অপতথ্য ছড়ানোর জন্য দেশী ও বিদেশী চক্রের বিনিয়োগ এবং অর্থায়নের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে এই অর্থায়িত অপপ্রচারের অর্থনীতি এখন শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত কয়েক মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হাজার হাজার ভুয়া ফটোকার্ড, এআই-জেনারেটেড ভিডিও ও ক্লোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সিআইডির সাইবার ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট জানিয়েছে, ভুয়া খবরের শিল্পটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি কোটি কোটি টাকার একটি সুসংগঠিত অর্থায়ন চক্র। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বাংলাদেশে সক্রিয় ‘ফেসবুক পেজ ম্যানেজার’ এবং ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের’ ক্রিপ্টো ওয়ালেটে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এই বছর ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রিতে লেনদেনের হার ৪২০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরে ভুল তথ্য ছড়ানোর পেছনে বিনিয়োগের পরিমাণ সামগ্রিকভাবে ৩৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এএফপি ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো সমন্বিত অপপ্রচারের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু বিদেশী নেটওয়ার্ক ও হ্যান্ডেল থেকে স্পনসর বা পেইড বুস্টিং করা হয়েছে। ক্লিকবেইট ও চাঞ্চল্যকর ভুয়া খবর প্রচার করে এডসেন্স এবং সামাজিক মাধ্যমের ভিউ থেকে অর্থ উপার্জন। ব্যবহারকারীদের অ্যালগরিদমিক বাবলের ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ ট্রাফিক জেনারেট করা হয় এবং পেপাল বা পেওনিয়ারের মাধ্যমে এই ডলারগুলো বাংলাদেশে আসে।

একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক প্রচার ও গুজব ছড়ানোর জন্য ফেসবুক ও ইউটিউবে বুস্টিং এবং ট্রল আর্মি পরিচালনায় প্রতি মাসে গড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় হতো। চলতি বছরে এআই ক্লোনিং সফটওয়্যার, ডিপফেক ভিডিও নির্মাণ এবং সমন্বিত বট নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য মাসিক বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক পাঁচ ৫ কোটি টাকা।

রিউমার স্ক্যানার এবং ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অপতথ্য ছড়ানোর হার আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই শনাক্তকৃত সুসংগঠিত ভুল তথ্যের সংখ্যা দুই হাজার ৪৫০টি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ৮২ শতাংশ কন্টেন্টই পেইড বুস্টিং বা স্পনসরড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ডিপফেক ও এআই কন্টেন্টের ব্যবহার ৪০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে কয়েক শত সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির ঘটনা ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি মূলধারার নিউজ পোর্টালের হুবহু নকল ডোমেইন বা ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

সিআইডি জানায়, আমরা ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রির আর্থিক লেনদেনের রুটগুলো ট্র্যাক করছি। এটি শুধু তথ্যপ্রযুক্তির অপরাধ নয়, এর পেছনে বড় ধরনের অবৈধ মানিলন্ডারিং জড়িয়ে রয়েছে। হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকে যেসব অ্যাকাউন্টে অর্থ আসছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তায় সেগুলো ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যেই তার চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্থায়নের তথ্য সিআইডির হাতে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ এর সহায়তায় আমরা ইতোমধ্যে ১৭টি বড় ফাইন্যান্সিয়াল চেইন ব্লক করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যারা রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করছে এবং দেশের শান্তি বিনষ্টের চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করতে র‌্যাবের সাইবার মনিটরিং সেল ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ভুয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর গ্রুপ এবং পেইড বুস্টিং সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোর পেছনে সরাসরি কার টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, তা দ্রুতই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। গত বছর যেখানে দিনে গড়ে ৫০টি গুজব ছড়াত, এই বছর অর্থায়নের জোড়ে তা দিনে ২০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। র‌্যাবের সাইবার উইং মেটা ও গুগলের সিকিউরিটি টিমের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করছে যাতে এই পেইড ক্যাম্পেইনগুলোর উৎস দেশ ও কার্ডের তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তথ্য মতে, ভুয়া লোগো এবং মূলধারার মিডিয়ার নাম ভাঙিয়ে যারা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের স্থানীয় সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কিছু আইটি সেল গঠন করে তরুণদের টাকার বিনিময়ে এই ভুয়া তথ্য রি-শেয়ার এবং ভাইরাল করার কাজে খাটানো হচ্ছে। এই চক্রের মূল হোতা ও অর্থদাতাদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফেক নিউজ এখন আর কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। যখন কোনো বড় গোষ্ঠী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পরিকল্পিতভাবে সমাজকে পোলারাইজড বা বিভক্ত করতে চায়, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অর্থায়নের উৎস বন্ধ করতে না পারলে শুধু আইন দিয়ে এটি রোখা সম্ভব নয়।

ফ্যাক্ট-চেকিং বিশেষজ্ঞ কদরুদ্দীন শিশির বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যা মানুষের ক্ষোভ ও উত্তেজনাকে পুঁজি করে ভিউ বাড়ায়। মেটা বা অ্যালফাবেটের মতো টেক জায়ান্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যেন তারা বাংলাদেশ কেন্দ্রিক এআই-ডিপফেক এবং ভুয়া নিউজ পোর্টালগুলোর মনিটাইজেশন বন্ধ করে। একই সাথে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে আরো দ্রুততার সাথে সঠিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি, আর্থিক উৎসের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জনগণের সচেতনতাই পারে এই বহু কোটি টাকার ‘ফেক নিউজ ইন্ডাস্ট্রি’ ভেঙে দিতে।