মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পুঁজিবাজার

মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানি ‘জেড’ গ্রুপের

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সারা বিশ্বের মতো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। আগের সপ্তাহে যুদ্ধের প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজারগুলো যে পরিমাণ সূচক হারিয়েছিল, গত সপ্তাহে তার বড় একটি অংশই ফিরে পেয়েছে। রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে বড় পতনের পর পরবর্তী চারটি কর্মদিবসেই দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের উন্নতি ঘটে। এতে হারানো সূচকের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় বাজারগুলো। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে বাজার এবং পুঁজিবাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।

গত সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্কা খায় দেশের দুই পুঁজিবাজার। এর আগের সপ্তাহে যুদ্ধের ভয়াবহতার শুরুতে বড় ধরনের দরপতন ঘটলেও শেষ দিকে এসে বিক্রয়চাপ কিছুটা কমে। বিনিয়োগকারীরাও ধীরে ধীরে বাজারে ফিরতে শুরু করেন। কিন্তু রোববার হঠাৎ তীব্র বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। ওই দিন ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ২৩১ পয়েন্ট এবং চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার প্রায় ৪০০ পয়েন্ট হারায়।

তবে পরদিন থেকেই বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরে আসে। টানা দুই দিন বড় ধরনের উন্নতি ঘটে দুই বাজারের সূচকে। অনেকটা মরিয়া হয়ে বিনিয়োগকারীদের বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তারাই সফল হন। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসেও সূচকের বড় উন্নতির মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকা বিনিয়োগকারীরা এবার আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মূলধন রক্ষায় বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন। আগে সামান্য কারণেই যেখানে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রির প্রতিযোগিতা দেখা যেত, এখন সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১২৭ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। প্রথম কার্যদিবসে বড় পতনের পরও পরবর্তী চারটি কর্মদিবসে সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতির ফলে এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক যথাক্রমে ৫৪ দশমিক ৭৪ ও ৩০ দশমিক ৭০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।

এর আগের সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে প্রধান সূচকটি ৩৫৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট বা ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে যায়। আর রোববার সপ্তাহের শুরুতেই সূচকের ২৩১ পয়েন্ট হারায় বাজারটি।

সূচকের উন্নতির ফলে গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনে যোগ হয়েছে আট হাজার ৯৬১ কোটি টাকা। ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন সপ্তাহ শেষে বেড়ে দাঁড়ায় সাত লাখ ছয় হাজার ৯৫১ কোটি টাকায়।

বরাবরের মতো ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিই বাজার মূলধনে বড় অবদান রাখে। এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতের দুই বহুজাতিক কোম্পানি ও লাফার্জ হোলসিমের মতো বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াও বাজার মূলধন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এর আগের সপ্তাহে বাজারটি ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন হারিয়েছিল।

তবে সূচকের উন্নতি হলেও গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন কমেছে। ফেলে আসা সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে দুই হাজার ৬৫৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের থেকে ২৩ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল তিন হাজার ৪৮২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

একই হারে কমেছে বাজারটির গড় লেনদেনও। গত সপ্তাহে ডিএসইতে গড় লেনদেন ছিল ৫৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অথচ আগের সপ্তাহে গড় লেনদেন ছিল ৬৭৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা ২৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। এ সময় কোম্পানিটির শেয়ারের গড়ে প্রতিদিন ২৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।

একই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২৭ কোটি ১২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। এটি বাজারটির মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ১০ শতাংশ অবদান রাখে।

ডিএসইর সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্র্যাক ব্যাংক, রবি আজিয়াটা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, লাভেলো আইসক্রিম, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট ও ইনটেক অনলাইন।

এ দিকে গত সপ্তাহে ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির সবগুলোই ছিল ‘জেড’ গ্রুপভুক্ত। এর মধ্যে ছয়টি ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সের শেয়ারের মূল্য ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই খাতের পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফিন্যান্স ও ফার ইস্ট ফিন্যান্স- এই তিন কোম্পানির শেয়ারের মূল্যও ৫০ শতাংশ করে বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার লিজিংয়ের শেয়ারের দাম ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ, ফ্যামিলিটেক্স ২৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ, এইচ আর টেক্সটাইলস ২৫ শতাংশ, মেঘনা কনডেন্সড শিল্ক ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ ২২ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের শেয়ারের দাম ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।