মুখ থুবড়ে পড়েছে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কার্যক্রম

মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমে’র কার্যক্রম। পতিত আওয়ামী সরকার বহু ‘ঢোল-ঢাল’ পিটিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট এই স্কিমটি চালু করেছিল। বলা হয়েছিল, সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-বিভিন্ন বাহিনী, শিক্ষকসহ সমাজের নানা স্তরে মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু চালু হওয়ার তিন বছরের মাথায় কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ ছাড়া সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-শিক্ষকদের এই স্কিমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি চাকুরে ও শিক্ষকরা কেউ-ই এই কর্মসূচির আওতায় আসার ঘোরবিরোধী। কিন্তু আইনে ছিল এই স্কিমে তাদেরকেই প্রথমে নিয়ে আসা হবে। তাই কর্মসূচিটি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে সর্বজনীন পেনশন স্কিমবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে সর্বজনীন পেনশন স্কিমবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়

  • তিন বছরেও সরকারি চাকুরেদের এর আওতায় আনা যায়নি
  • ২০ মাসে সদস্য সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৫,১৭৪ জন!

মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমে’র কার্যক্রম। পতিত আওয়ামী সরকার বহু ‘ঢোল-ঢাল’ পিটিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট এই স্কিমটি চালু করেছিল। বলা হয়েছিল, সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-বিভিন্ন বাহিনী, শিক্ষকসহ সমাজের নানা স্তরে মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু চালু হওয়ার তিন বছরের মাথায় কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ ছাড়া সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-শিক্ষকদের এই স্কিমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি চাকুরে ও শিক্ষকরা কেউ-ই এই কর্মসূচির আওতায় আসার ঘোরবিরোধী। কিন্তু আইনে ছিল এই স্কিমে তাদেরকেই প্রথমে নিয়ে আসা হবে। তাই কর্মসূচিটি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিøষ্টরা।

২০ মাসে মাত্র ৫,১৭৪ জন!

মজার ব্যাপার হচ্ছে- বিগত ২০ মাসে এই কর্মসূচির আওতায় মাত্র ৫,১৭৪ জনকে আনা সম্ভব হয়েছে।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কর্মসূচি

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছেন, সরকারি এই স্কিম বছর দুই ধরে গ্রাহকদের অভাবে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রথম বছরে প্রতিদিন যেখানে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ৪-৫ হাজার মানুষ এনরোলমেন্ট বা নিবন্ধন করত, গত দুই বছর ধরে তা কমে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। এমনকি মাসের পর মাস একজন গ্রাহককেও এই স্কিমে যুক্ত হতে দেখা যায়নি।

বকেয়া পড়ছে কিস্তিও

আবার যারা আগে প্রতি মাসে কিস্তির টাকা দিতেন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় তাদের অধিকাংশই এখন আর চাঁদাও দেন না। এর প্রধান কারণ এই স্কিমের সাথে সরকারি, স্বায়ত্তশাষিত এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের জন্য নির্ধারিত ‘প্রত্যয়’ স্কিমটি ব্যাপক সমালোচনা ও অন্দোলনের মুখে পতিত সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে সার্কুলার জারি করে প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে পুরো স্কিম এখন বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ কারণে স্কিমের সফলতার মুখ তো দেখেইনি। উল্টো এটি এখন সরকারের দায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অনেকে বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্নবিদ্ধ এই স্কিমটি চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ এই স্কিমটি চালানোর জন্য সরকারকে প্রতি মাসে একটা মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আর এটি কিছু অবসরভোগী কর্মকর্তাদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অর্থ বিভাগের কিছু কর্মচারী অতিরিক্ত অর্থের আশায় এখানে যোগও দিচ্ছেন।

কর্তৃপক্ষ না শে^তহস্তি

এ দিকে এই স্কিমের নতুন গ্রাহক যুক্ত হোন বা নাই হোন, স্কিম পরিচালনার জন্য গঠিত ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষে’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঠিকই বহন করতে হচ্ছে। এ জন্য মাসে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে পুরো কর্তৃপক্ষই কয়েক বছর ধরেই এক প্রকার ‘শ্বেতহস্তিতে’ পরিণত হতে চলেছে। কারণ কর্তৃপক্ষের একজন নির্বাহী চেয়ারম্যানের বেতনই সাড়ে তিন লাখ টাকা। এর সাথে যোগ হচ্ছে সার্বক্ষণিক ড্রাইভারসহ গাড়ি সুবিধা এবং প্রকৃত ব্যয় অনুযায়ী টেলিফোন ও মোবাইল সুবিধা। একইভাবে কর্তৃপক্ষের সদস্যদের বেতন নির্ধারিত রয়েছে তিন লাখ টাকা। সাথে সার্বক্ষণিক ড্রাইভারসহ গাড়ি সুবিধা এবং প্রকৃত ব্যয় অনুযায়ী টেলিফোন ও মোবাইল সুবিধা। প্রতি মাসে তারা এই অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

এই বাস্তবতায় গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে সর্বজনীন পেনশন স্কিমবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: সুরাতুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং অর্থ সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সভা শেষে জানানো হয়, সভায় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা প্রদান করেন। উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয় যে, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত চারটি স্কিমে (প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা) মোট ৩,৭৭,৫৪৫ জন নাগরিক নিবন্ধিত হয়েছেন এবং পেনশন তহবিলে মোট জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। মুনাফাসহ এ পর্যন্ত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৭৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

নিবন্ধনের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর এই প্রতিবেদককে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন সদস্য এবং অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিল, গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পেনশন স্কিমে মোট নিবন্ধনধারী সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৭১ জন। এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে চাঁদা হিসেবে পাওয়া গেছে ১৩০ কোটি ৩৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এই অর্থ সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই হিসেবে গত দেড় বছরের (২০ মাসে) এই স্কিমের সাথে মাত্র ৫ হাজার ১৭৪ জন নতুন করে যোগ হয়েছেন।

অর্থমন্ত্রীর কাছে সত্য গোপনের অভিযোগ!

অর্থ বিভাগের নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবারের সভায় পেনশন স্কিমের বর্তমান অবস্থা অর্থমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এখানে অনেক তথ্য তার কাছে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে, এই স্কিমের যে সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল সেটি বলা হয়নি। তুলে ধরা হয়নি, বিগত দুই বছরে কি পরিমাণ মানুষকে এই আওতায় আনা হয়েছে। পেনশন কর্তৃপক্ষের খরচের হিসাবও মন্ত্রীকে দেয়া হয়নি। বলা হয়নি, স্কিমের চাঁদার অর্থ বিভিন্ন লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে। কিন্তু একমাত্র ট্রেজারি বিল-বন্ড ছাড়া আরো কোথাও এই অর্থ রাখা সম্ভব হয়নি।

বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনও রাখা হয়েছে। এখানে বলা হয়নি, সরকারি চাকুরেদেরসহ অন্যান্য পেশাজীবীদের এর আওতায় আনা না হলে কখনোই এই কর্মসূচি সফল হবে না।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার আশায় বিগত হাসিনা সরকার এই স্কিমটি চালু করে। সমতা, সুরক্ষা, প্রগতি ও প্রবাস-এই চারটি স্কিমের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

পরে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নতুন করে যুক্ত করা হয় ‘প্রত্যয় স্কিম’। এই স্কিমে শুধুমাত্র সব স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী চলতি ২০২৪ সালে ১ জুলাই তারিখ ও তৎপরবর্তী সময়ে নতুন যোগদান করবেন, তাদেরকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে গত আগস্টে পুরো প্রত্যয় স্কিম বাতিল করে দেয়া হয়।

গত ২ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় এই মর্মে জানানো যাচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থার কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যয় স্কিমসহ সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।