লেবানন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে

Printed Edition

মনির হোসেন

  • কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ
  • ফ্লাইট শিডিউল পেলেই নারীকর্মীর লাশ দেশে আসবে
  • দূতাবাসের সত্যায়ন না থাকায় বহির্গমন ছাড়পত্র হচ্ছে না

লেবানন সীমান্তের একটি অংশে ইসরাইলী সৈন্যরা অবৈধভাবে ঢুকে দখল করে নেয়ার ফলে এখনো লেবাননের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় আবারো শুরু হতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তাই এসব এলাকায় অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। দূতাবাস থেকে তাদের নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের খাদ্যসহায়তা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী, দুবাই ও বাহরাইনসহ অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে এসব দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীরা জানিয়েছেন।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম এখনো দেশটির সরকার শুরু করতে পারেনি। যার কারণে ফ্লাইট উঠানামা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিধ্বস্ত বিমানবন্দরের পরিস্থিতি দেখতে কুয়েতের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেন। তবে অন্যান্য দেশের বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন দেশী-বিদেশী এয়ারলাইন্সসংশ্লিষ্টরা।

গত বুধবার বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো: কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ যেসব দেশে ফ্লাইট চলাচল করে সবগুলো দেশেই ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। গত ২৮ ফ্রেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মতো ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটসূচিতেও সাময়িক বিচ্যুতি ঘটেছিল। পরিস্থিতির উন্নতির সাথে সাথে দুবাই, শারজাহ, আবুধাবী, দোহা, মাস্কাট, রিয়াদ, জেদ্দা রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে।

গত বুধবার রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী টার্মিনাল ২ এর সামনে ওমান প্রত্যাগত এক যাত্রী যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদককে বলেন, ওই দেশে যুদ্ধ হলেও আমরা বুঝতে পারি নাই। তিনি ছুটিতে এসেছেন। দেড় মাস পর আবার ফিরে যাবেন বলে জানান তিনি।

গতকাল দুপুরে লেবাননের বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ও দূতালয় প্রধান মো: আনোয়ার হোসেন নয়া দিগন্তকে লেবাননের সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, যুদ্ধবিরতি হলেও লেবাননের পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। লেবাননের সাথে ইসরাইলের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কখন কি হয় তার কোনো কিছুই বলা যাচ্ছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইসরাইলের সৈন্যরা লেবাননের বর্ডার এলাকার (দক্ষিণাঞ্চল) ইয়েলো জোনে ঢুকে পড়েছে। মাঝেমধ্যে ইসরাইলের সৈন্যরা আক্রমণ চালায়। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাংলাদেশীরা কেমন আছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে যেসব কর্মী (বাস্তুচ্যুত) সমস্যায় আছে তাদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে খাদ্যসহায়তা দেয়া হচ্ছে। আমরা তাদের প্রতিনিয়ত সেগুলো দেয়ার ব্যবস্থা করছি।

যুদ্ধে বাংলাদেশীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত বৈরুতের হামলার এলাকায় একজন বাংলাদেশী নারী কর্মী নিহত হয়েছেন। এ সময় তার মালিকও সপরিবারে নিহত হয়েছে। তার লাশ মর্গে আছে। নারীকর্মীর লাশ কবে দেশে আসতে পারে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, মডলইস্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার লাশ দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছি।

এ দিকে লেবাননের পরিস্থিতি খারাপ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মিসাইল হামলা বন্ধ হওয়ায় আবারো এসব দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে। তবে কোনো দেশে পরিবেশ ফিরলেও বিমানবন্দর এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে ওই দেশে থাকা বাংলাদেশীসহ বিদেশী নাগরিকদের আসা যাওয়া করতে হচ্ছে সৌদি আরবের দাম্মাম সীমান্ত দিয়েই।

গতকাল কুয়েত থেকে বাংলাদেশী নাগরিক জালাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, যুদ্ধের কারণে আমাদের যে অবস্থা হয়েছিল সেটি এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো চালু হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইট কুয়েতে আসে না। সৌদির দাম্মাম হয়ে যাত্রীরা কুয়েত প্রবেশ করছেন। কর্মীরা বেতন পাঠানো শুরু করেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকেই সমস্যায় আছে। বেতন পাবে। তারপর টাকা পাঠাবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ে শ্রমবাজারের উপর। এতে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে যায়। অনেকে দেশে ফিরে আসারও সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরে আসেন। ভয়াবহ যুদ্ধে বোমা হামলায় পড়ে এক নারীসহ ৮ বাংলাদেশী নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যেগে খোলা কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়।

এ দিকে দেশগুলোতে শ্রমবাজারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশ দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়া কোনো কর্মীর নামে বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যু করছেন না। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, এসব শ্রমিকরা গিয়ে পরবর্তীতে সমস্যায় পড়লে তখন তাদের দায় মন্ত্রণালয় তথা বিএমইটি কর্তৃপক্ষের উপর পড়তে পারে। যা বাড়তি নতুন করে ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এই পেশার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব অপেক্ষমাণ কর্মীর বিদেশ যাত্রা সত্যায়নের না থাকার কারণে বন্ধ থাকলে তখন শ্রমবাজারেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন রেমিট্যান্স আসাও কমতে থাকবে।

তাদের বক্তব্য, ভিসা ঠিক থাকলে সেক্ষেত্রে দূতাবাসের সত্যায়ন না হলেও চলে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার পর অনুরোধ জানিয়েছেন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা।