প্রতি বছর এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সময়মতো না হওয়ার কারণে বিশাল সময়ের গ্যাপে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। একই সাথে এসএসসির পর কলেজে ভর্তি কিংবা উচ্চমাধ্যমিকের পর অনার্স বা উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে বড় ব্যবধানের একটি সময়ের লস হচ্ছে তাদের। অথচ এই তিনটি পরীক্ষা- পরীক্ষা বছরের মধ্যে নেয়া সম্ভব হলে ৪০ লাখ বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায় সহজেই। তিনটি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ৪০ লাখ হিসাব করলে সহজেই পুরো এই সময়টা ক্ষতির বা লসের আওতা থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে হটাৎ করেই পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নিজেই এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে সিলেটে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে লস হয়ে যাওয়া এই বিশাল সময়ের হিসাব দিয়েছেন। একই সাথে তিনি কিভাবে এই লস কাটিয়ে উঠা যায় তারো একটি গাইডলাইন দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, দেশে এখন এসএসসি এবং এইচএসসি মোট পরীক্ষার্থী হবে ৩২ থেকে ৩৪ লাখ। আবার উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রতি বছর প্রস্তুতি নেয় আরো ৮ থেকে ১০ লাখ শিক্ষার্র্থী। এই ৪০ থেকে ৪৪ লাখ শিক্ষার্থী যদি তিনটি পরীক্ষা মিলে এক বছর সময় লস করে তাহলে তো শুধু গ্যাপ আর লসের ফাঁদে পড়েই ৪০ লাখ বছরের বেশি সময় চলে যাচ্ছে। আমাদের এই সময়েরও হিসাব করতে হবে। শুধু সঠিক পরিকল্পনা আর তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পুরো এই ৪০ লাখ বছর আমরা অনায়াসেই সাশ্রয় করতে পারি।
ইতোমধ্যে দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি ও এইচএসসি) এগিয়ে নিয়ে আসার বিষয়ে কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন প্রতি বছরের এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষা ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসেই নেয়া হবে। একইভাবে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষাও বছর শেষেই নেয়া হবে। এখন এই পরীক্ষা দু’টি এপ্রিল এবং জুনে অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য ২০২১ সালের পর করোনা মহামারীর কারণে পরীক্ষা দু’টি জুনের পরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন আগের সেই রীতি থেকে বের হতে হবে। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে গড়ে এক বছর করে হলেও ৪০ লাখ বছর সাশ্রয় করতে হবে।
এ দিকে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বর্তমানে চলমান রয়েছে। আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হবে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধে নামতে হয় শিক্ষার্থীদের। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ তিনটি গুচ্ছে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় তাদের। এতে কয়েক মাস ধরে তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি জেলায় জেলায় সফর করতে হয়। ফলে ভোগান্তির শিকার হওয়ার পাশাপাশি বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় হয় ভর্তি ইচ্ছুকদের। এ অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি দিতে সব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একক ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি।
তবে সম্প্রতি একাধিকবার শিক্ষামন্ত্রী এ ইস্যুতে কথা বলার পর আবারো সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা চলতি বছরের ডিসেম্বরে নেয়া হবে। একইভাবে এগিয়ে আসবে এইচএসসি পরীক্ষাও। এইচএসসির ফল প্রকাশের পরপরই কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যায়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের কাজ করার কথা বলেছেন। এ জন্য ইউনিভার্সিটিগুলোর সাথে বসে ইউজিসির সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে একাধিকবারই বলেছেন যে, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের আগেই আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সেশনজট নিরসনে এমন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তার ভাষ্য, একইভাবে এইচএসসি পরীক্ষাও এগিয়ে আসবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল, চলবে ২০ মে পর্যন্ত। আর এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে ২ জুলাই শুরু হয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করলে অক্টোবর মাসের শুরুতেই ফলাফল প্রকাশ হতে পারে। সে হিসাবে এবার নভেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষায় নামতে হতে পারে শিক্ষার্থীদের। সূত্র আরো জানায় আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষা চলতি বছরের ডিসেম্বরে শুরু হলে তা জানুয়ারিতে শেষ হওয়া কথা। এর দুই মাস পর মার্চের দিকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলে এপ্রিলে শেষ হবে। তবে এ পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতেও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ৬০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ জুনের শেষে ফলাফল প্রকাশ হলে জুলাই থেকেই ভর্তি যুদ্ধে নামতে হতে পারে শিক্ষার্থীদের। অর্থাৎ মন্ত্রীর উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আগামী বছরের ভর্তি পরীক্ষা অন্তত চার মাস এগিয়ে আসতে পারে ভর্তি পরীক্ষা।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আসার বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান (প্রেষণে) অধ্যাপক আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম জানান, ‘শিক্ষামন্ত্রী শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে চেষ্টা করেছেন। এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে আনার কথা বলেছেন তিনি। এমন সময়সীমা বাস্তবায়ন সম্ভব, তবে আমাদের ওপর কিছুটা চাপ বাড়বে। এ ছাড়া ফরম পূরণ, টেস্ট পরীক্ষার বিষয় আছে। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আ ন ম এহছানুল হক মিলন তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তার মতে এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা-সমন্বয়হীনতার কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতি বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০ লাখ বছর সময় অপচয় হচ্ছে। তিনি বলেন, এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়ার জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে, যা দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে একটি সমন্বিত ভর্তিব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।



