ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় রাজনৈতিক প্রচারণা সীমাবদ্ধ ছিল পোস্টার-ব্যানার, লিফলেট, পথসভা কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অংশের মতামত এখন নির্ভর করছে বিশেষ ‘সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ার রুম’-এর ওপর। এসব ওয়ার রুম পরিচালিত হচ্ছে সংগঠিত টিমের মাধ্যমে। যেখানে কনটেন্ট নির্মাতা, ভিডিও এডিটর, ট্রল অপারেটর, গ্রাফিক ডিজাইনার ও ডাটা বিশ্লেষকরা একসাথে কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু প্রচারণার উপায় নয়; বরং এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জনমত নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। একই সাথে বেড়েছে ফেক নিউজ, ডিপফেক ভিডিও, ট্রলিং ও সমন্বিত অপপ্রচারের প্রবণতা।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্কানারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৯৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে। শুধু এই প্ল্যাটফর্মেই শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৭৩২টি ভুল তথ্য। এ ছাড়া টিকটকে ৩৬৮টি, ইউটিউবে ১১৫টি এবং ইনস্টাগ্রামে ২৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ইস্যুকেই কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর ডিজিটাল ওয়ার রুম এখন অনেকটাই করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং সেলের মতো পরিচালিত হয়। নির্দিষ্ট কক্ষে বসে একাধিক টিম সার্বক্ষণিক সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং করে। কোন ইস্যু ভাইরাল হচ্ছে, কোন পোস্টে মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি, কোন বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, এসব বিশ্লেষণ করে সাথে সাথে নতুন কনটেন্ট তৈরি করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, নিজেদের নেতাদের পক্ষে জনমত তৈরি এবং অনলাইন আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নেয়াই এসব টিমের মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ওয়ার রুমের অন্যতম বড় অংশ হচ্ছে ‘ট্রল নেটওয়ার্ক’। সাধারণত শত শত ফেক আইডি, গোপন গ্রুপ ও সমন্বিত পেজ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়। কোনো বক্তব্য বা ছবি ভাইরাল করতে একই সময়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট ও শেয়ার করা হয়। অনেক সময় ভুয়া ফটোকার্ড বা এডিট করা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়।
সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের মতো লোগো ও ডিজাইন ব্যবহার করে এসব ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে। পরে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কখনোই এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম এএফপি ফ্যাক্টচেক বাংলাদেশ বলছে, রাজনৈতিক বিভাজন যত বাড়ছে, অপতথ্যের প্রবাহও তত বাড়ছে। বিশেষ করে নির্বাচন ঘিরে ফেক নিউজ এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন আর শুধু ভুয়া পোস্ট নয়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও ও অডিওও তৈরি করা হচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোনো নেতার কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে এডিট করা ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-নির্ভর অপপ্রচার এখন সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। কারণ সাধারণ ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না কোনটি আসল আর কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা।
রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজনৈতিক ডিপফেক ও এআই-নির্ভর অপতথ্যের ব্যবহার ৪০৯ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের সময় এই প্রবণতা আরো বাড়তে পারে। এদিকে রাজনৈতিক ট্রলিংয়ের বড় শিকার হচ্ছেন নারী রাজনীতিক, নারী সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মীরা। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৪৭২টি অপতথ্য নারীদের কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, এডিট করা ছবি বা মিথ্যা সম্পর্কের গল্প ছড়ানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দিতে এবং সামাজিকভাবে হেয় করতেই এসব কৌশল ব্যবহার করা হয়। এতে শুধু ব্যক্তিগত মানহানি নয়, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বাইরে থেকেও অনেক অপতথ্য পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন ভুয়া পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের সাইবার ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, শতাধিক ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে সাইবার পেট্রোলিংও। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সাথে সরাসরি সমন্বয়ের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে অভিযোগ পাঠানো হলেও দ্রুত কনটেন্ট সরানো সম্ভব হয় না।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ‘ভিউ ব্যবসা’ নতুন এক সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ ইচ্ছাকৃতভাবে চটকদার শিরোনাম ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করছে শুধু ভিউ বাড়ানোর জন্য। পরে সেই কনটেন্ট সরাতে অর্থ দাবি করার অভিযোগও উঠেছে।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু সঙ্ঘবদ্ধ চক্র এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভুয়া স্ক্যান্ডাল তৈরি করছে। এরপর ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন করেছে। জার্মানিতে ২০১৮ সালে কার্যকর হওয়া আইনের আওতায় আপত্তিকর কনটেন্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে ব্যক্তি ও কোম্পানির বিরুদ্ধে কোটি কোটি ইউরো জরিমানার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের এ সংক্রান্ত আইন ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অস্ট্রেলিয়াতেও সহিংস ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন কার্যকর করেছে।
বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও নাগরিকবান্ধব আইন প্রণয়নের দাবি উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন নয়; ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোও জরুরি। মানুষকে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ট্রল নেটওয়ার্ক ব্যবহার, অপপ্রচার চালানো কিংবা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেটি যদি সংগঠিত অপপ্রচার, ডিজিটাল সহিংসতা ও বিভাজনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্র বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে পারে।



