ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করেছিল ৪১৩ রান। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি, মুমিনুল হকের ৯১ এবং মুশফিকুর রহীমের দায়িত্বশীল ৭১ রানের ইনিংসে বড় সংগ্রহ পেয়েছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাটাররা যখন জবাব দিতে শুরু করেন, তখন ম্যাচে ফিরে আসার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল একজন আক্রমণাত্মক বোলারের। সেই দায়িত্বটাই কাঁধে তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এই ফাইফার শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ম্যাচের প্রেক্ষাপটেও ছিল দারুণ মূল্যবান।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনটা হয়ে রইল পুরোপুরি মিরাজময়। দুর্দান্ত অফ স্পিনে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়ে ক্যারিয়ারের ১৪ বার টেস্টে পাঁচ উইকেট শিকার করেছেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। তার ঘূর্ণি জাদুতেই প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান অলআউট হয়েছে ৩৮৬ রানে। ফলে বাংলাদেশ পেয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ২৭ রানের লিড।
তৃতীয় দিনের শুরুতে পাকিস্তান ছিল বেশ স্বস্তির অবস্থানে। ওপেনার আজান আওয়াইস ও আবদুল্লাহ ফজলের ব্যাটে বড় সংগ্রহের দিকেই এগোচ্ছিল সফরকারীরা। তবে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মিরাজ। ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের মিডল অর্ডারে ধস নামান। বিশেষ করে অভিজ্ঞ ব্যাটারদের বিপক্ষে তার নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ এবং টার্ন ছিল চোখে পড়ার মতো।
মিরাজ তার ১৪তম টেস্ট ফাইফার পূর্ণ করেন পাকিস্তানের তারকা পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদিকে আউট করে। এই উইকেটের মধ্য দিয়েই টেস্ট ক্যারিয়ারে আরেকটি মাইলফলক স্পর্শ করেন। বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি পাঁচ উইকেট শিকারের তালিকায় তিনি আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে সাকিব আল হাসান ও তাইজুল ইসলামের পর অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্পিনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মিরাজ, আর মিরপুরে তার এবারের স্পেল সেই সামর্থ্যরেই নতুন প্রমাণ।
মিরাজের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য। উইকেট থেকে খুব বেশি সাহায্য না পেলেও তিনি ব্যাটারদের ভুল করাতে বাধ্য করেছেন। কখনো অফস্টাম্পের বাইরে টার্ন, কখনো বা সোজা বল-দুই দিক থেকেই চাপে রেখেছেন পাকিস্তানি ব্যাটারদের। তার স্পিন বৈচিত্র্যের সামনে পাকিস্তানের মিডল অর্ডার ছিল পুরোপুরি অসহায়।
২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই পাঁচ উইকেট শিকার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন মিরাজ। এরপর গত এক দশকে বাংলাদেশের টেস্ট দলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছেন তিনি। ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার কারণে দলে তার মূল্য আরো বেড়েছে। মিরপুর টেস্টে এই ফাইফারের মাধ্যমে মিরাজ আবার প্রমাণ করলেন, বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের নেতৃত্ব দেয়ার সামর্থ্য তার রয়েছে। ম্যাচের চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের সামনে এখন লক্ষ্য থাকবে লিড আরো বড় করে পাকিস্তানকে চাপে ফেলা। আর সেই স্বপ্ন দেখার সাহস এনে দিয়েছেন মিরাজ, তার ক্যারিয়ারের স্মরণীয় ১৪তম টেস্ট ফাইফারে।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেট বরাবরই স্পিনারদের স্বর্গ বলে পরিচিত। তবে সব স্পিনারই এই উইকেটে নিজের নাম ইতিহাসে লিখে যেতে পারেন না। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় দিনের খেলা শেষে আরেকবার সেই বিশেষ তালিকায় নিজের নাম উজ্জ্বল করলেন মিরাজ। সতীর্থদের অভিনন্দনে হাসিমুখে উদযাপন করেন বাংলাদেশের এই স্পিনার। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি শুধু একজন অফস্পিনার নন, বরং দলের ক্রাইসিস ম্যান হিসেবেও পরিচিত। একজন স্পিনার শুধু বল ঘোরাননি, ঘুরিয়ে দিয়েছেন পুরো ম্যাচের গতিপথও।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে মিরাজ জানালেন, ‘এক দিকে পেস আরেক দিকে স্পিন। তাতে কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে ব্যাটারদের। ব্যাটারদের যেমন জুটি হয়, তেমনি বোলারদেরও জুটি হয়েছে। আমাদের প্রধান পরিকল্পনা ছিল যেহেতু রান অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাই রান আটকানো। মিতব্যায়ী হওয়ার চেষ্টা করেছি। অবশেষে রান আটকানোর পাশাপাশি উইকেট পেয়েছি।’ চতুর্থ দিন নিয়ে মিরাজের ভাবনা, ‘আমরা যদি ২৯০-৩০০ করতে পারি, সেটি হবে বেস্ট। তবে মিরপুরে কত রান নিরাপদ সেটি বলা মুশকিল।’



