গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচজনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার

স্ত্রী-সন্তান ও শ্যালককে হত্যার পর ঘাতক পলাতক

Printed Edition

গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- এক নারী, তার তিন সন্তান ও ভাই। এ ঘটনার পর থেকে পরিবারের কর্তা ফোরকান মিয়া (৪০) পলাতক রয়েছেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন।

গতকাল ভোরে উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা পূর্বপাড়া এলাকায় প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলার একটি ভাড়া বাসা থেকে রক্তাক্ত লাশগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন- ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩২), তাদের বড় মেয়ে মীম (১৬), মেজো মেয়ে মারিয়া (৮), ছোট মেয়ে ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)। নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাৎ মোল্লার বাড়ি গোপালগঞ্জের পাইককান্দি এলাকায় এবং ফোরকানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলা সদরের মেরী গোপীনাথপুর এলাকায়। তিনি ওই এলাকার আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে। ফোরকান স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মনিরের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ফোরকান মিয়া পেশায় প্রাইভে টকার চালক। প্রায় এক বছর আগে তিনি পরিবার নিয়ে ওই বাসায় ভাড়া ওঠেন। শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে কোনো একসময় এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার সকালে ঘরের দরজা খোলা দেখে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে ভেতরে প্রবেশ করে রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখে তারা পুলিশে খবর দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল তিন শিশুর লাশ। তাদের গলা কাটা ছিল। অপর কক্ষে শারমিন আক্তারের লাশ জানালার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। তার হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। খাটের উপর পড়ে ছিল রসুল মিয়ার লাশ। ঘরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ঘটনাস্থলের বীভৎস দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

নিহত শারমিনের চাচা মো: উজ্জ্বল মোল্লা জানান, প্রায় ষোল বছর আগে পারিবারিকভাবে বেকার যুবক মো: ফোরকানের সাথে শারমিনের বিয়ে হয়। পরে ফোরকান গাড়ি চালানো শিখে নিজের সঞ্চিত কিছু টাকা, শ্বশুরবাড়ি ও স্বজনদের কাছ থেকে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ধার করে একটি প্রাইভেট কার কিনে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শারমিনকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে। তাদের সংসারে পরপর তিনটি কন্যাসন্তান জন্ম নিলে ফোরকান আবার বিয়ে করার পাঁয়তারা শুরু করে এবং শারমিনের ওপর শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। উত্তরার বাসায় একটানা বেশ কিছু দিন আটক রেখে নির্যাতন করার ফলে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় সাত মাস আগে শারমিন গোপালগঞ্জে বাবার বাড়িতে চলে যায়। সেখানে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর ফোরকান সেখানে সবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে শারমিনকে নিয়ে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতে থাকে।

পুলিশ নিহতের স্বজনদের বরাত দিয়ে জানায়, ফোরকান বিভিন্ন সময়ে নেশা করত। শুক্রবার বেলা ৩টার সময় শ্যালক রসুলকে ফোন করেন ফোরকান। তিনি তাকে জানান, তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেতন ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। এই কথা শুনে রসুল সন্ধ্যার দিকে ফোরকানের বাড়িতে যান। রাত ৮টা পর্যন্ত নিহতদের ফোন খোলা ছিল। এরপর যোগাযোগ করা হলে সবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার সকাল ৮টার দিকে স্বজনরা জানতে পারেন শারমিন ও তার তিন সন্তান ও রসুলকে মেরে ফেলা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে ফোরকান পলাতক।

খবর পেয়ে কাপাসিয়া থানা পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আলামত সংগ্রহ করে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম আরো জানান, ঘটনার পর থেকে গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করে পালিয়ে গেছেন। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেল) আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতক ফোরকানকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।