আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু : কর্তৃপক্ষ বলছে, এসির গ্যাস লিকেজ

তদন্ত কমিটি গঠিত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সর্বত্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প খরচে সেবা দেয়া বেসরকারি এই হাসপাতালটিতে শিশু মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গর্ভবতী মায়েদের নিরাশ করেছে যারা, তাদের মধ্যে আতঙ্কও বিরাজ করছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসির ত্রুটির কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এই ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছে। ২৬ মে দিবাগত রাত ৩টা থেকে পরদিন সকালের মধ্যে শিশু ছয়টির মৃত্যু ঘটে। তবে ঘটনাটি ২৭ মে সকালে প্রকাশ্যে আসে। প্রত্যক্ষদর্শী হাসপাতালের কর্মী ও শিশুদের স্বজনদের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে হঠাৎ এসি বন্ধ হয়ে ওয়ার্ডের ভেতর প্রচণ্ড ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকায় সেখানে বাতাস চলাচলের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না। স্বজনরা জানিয়েছেন, এর ফলে তীব্র শ্বাসকষ্টে শিশুদের মৃত্যু হয়। একই সাথে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে কয়েকজন মাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর সঠিক কারণটি জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হাসপাতালে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ত্রুটি ও অক্সিজেন লাইনে সমস্যা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে গতকাল রোববার পর্যন্ত তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দিতে পারেননি। জানা গেছে, রিপোর্ট জমা দিতে আরো কমপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো: মহসিন তদন্ত কমিটির প্রধান। তিনি তার কাজের জন্য বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের নিউনেটালজিস্ট অধ্যাপক ডা: মনির হোসেনকে যুক্ত করেছেন। একই সাথে এসির বিষয়টি দেখার জন্য একজন এসি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারকেও নেয়া হয়েছে। মৃত্যু হওয়া শিশুদের পোস্টমর্টেম না হওয়ায় তদন্ত কমিটির সদস্যরা শিশুদের মা-বাবার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন। জানা গেছে, ইতোমধ্যে এক শিশুর মা-বাবার সাথে কথা বলেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, টেকনিক্যাল কারণে তদন্ত কমিটির সদস্যদের রিপোর্ট সময় মতো জমা দিতে পারেননি। মৃত শিশুদের পোস্টমর্টেম না হওয়ায় শিশুদের মা-বাবার সাথে কথা বলে মৃত্যুর কারণ জানতে চেষ্টা করছেন তারা। আশা করছি, আগামী ৩ জুনের মধ্যে তারা তাদের তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে পারবেন।

গতকালও আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তদন্ত কমিটির লোকজন পরিদর্শন করেছেন তদন্তের উদ্দেশ্যে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এইচ আর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম মুকুল জানিয়েছেন, ‘একজন ম্যাজিস্ট্রেট এসেছেন তদন্তের কাজে, তারা কাজ করছেন।’

এদিকে শিশুদের মৃত্যুর পর হাসপাতালটিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ভিড় করছেন। ঢাকার বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা আদ-দ্বীনের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করছেন। আদ্-দ্বীনের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে এখন বাইরের কোনো গোষ্ঠীর সাবোট্যাজ হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন। তদন্তের স্বার্থে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাচ্ছেন না। আদ্-দ্বীন একটি নারী ও শিশু হাসপাতাল এবং মেডিক্যাল কলেজ হওয়ায় হাসপাতালটিতে অনেক রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। ডাক্তার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যাপারটি বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের সামনে এত মানুষের ভিড় থাকায় রোগী সেবাও কঠিন হচ্ছে। ডাক্তার ও নার্সরা অনেকটা ভয়ে আছেন যে তারা মবের শিকার হন কি না।

মৃত ছয় শিশুর মধ্যে দু’টি শিশু ছিল যমজ। মাদারটেকের নন্দীপাড়ার বাসিন্দা এই শিশুদের মা জানিয়েছেন, বমি করার পর তার বাচ্চা দুটোর পুরো শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে, দ্রুত বাচ্চা দুটোকে আইসিইউতে নিয়ে গেছেন ডাক্তাররা। পরে ২৭ মে সকাল ১০টার দিকে বাচ্চা দুটো মারা গেছে বলে তিনি জানতে পারেন। ‘আইসিইউতে গেলে আমার বাচ্চারা ফেরত আসবে না তাতো জানতাম না’ বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশুরা ঠিক কেন মারা গেল তা তিনি বলতে পারছেন না বলে জানান।

একজন শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ এবং একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে জানান, কী হয়েছে তা তদন্তের পর জানা যাবে। তবে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসির গ্যাস লিকেজের কথা বলেছেন। গ্যাস লিকেজ হলে, সেই রুমের স্বাভাবিক বাতাস ভারি হয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ থাকলে শিশু কেন বয়স্কদেরই শ্বাস নিতে কষ্ট হবে। ফলে শ্বাসকষ্টে শিশুরা মারা যেতে পারে। গ্যাস লিকেজ না ঘটলে শিশুরা ইনফেকশনেও মারা যেতে পারে। আবার মা শিশুকে অনেকক্ষণ না খাওয়ালেও হাইপোগ্রাইসেমিয়ায় শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এসবই অনুমান, তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলেই কেবল বলা যাবে ঠিক কী ঘটেছিল’।

আদ্-দ্বীনের এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতক শিশুর আকস্মিক মৃত্যুর ব্যাপারে হাসপাতাল কতৃর্পক্ষ গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করছে। আকস্মিক এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গভীরভাবে মর্মাহত।

এই বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারিফুল খান বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয়টি নবজাতক শিশু মারা গিয়েছে, এটা ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এটার সঠিক কারণ বের করা না যায় ততক্ষণ হাসপাতালকে দোষারোপ করা ঠিক না। আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনার পেছনেথ যে এসির গ্যাস লিকেজ সামনে আসছে, যদি গ্যাস লিকেজই দায়ী হয়ে থাকে তবে এটি অনেক বড় আতঙ্কের খবর। হাসপাতাল যে একটা সংক্রমণ সেনসিটিভ জায়গা সেটাও সবাই জানে, আর এই আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মা ও শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড বলে আরো বেশি সেনসিটিভ। নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য একটি ভরসার স্থল ছিল এই হাসপাতাল। একাধিকবার আমি এই হাসপাতালের সেবা গ্রহণ করেছি। সঠিক কারণ না জেনে আগে থেকেই এই হাসপাতালটার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করা ঠিক না।