ময়মনসিংহ রেলপথে ‘মৃত্যুর মিছিল’

ট্রেনের ছাদ ও দরজায় ঝুলেই ঢাকায় ফিরছেন যাত্রীরা

Printed Edition
ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় ফেরার দৃশ্যটি গতকালের : নয়া দিগন্ত
ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় ফেরার দৃশ্যটি গতকালের : নয়া দিগন্ত

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ থেকে

ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেলপথ যেন আবারো পরিণত হয়েছে এক ভয়ঙ্কর ‘মৃত্যুর করিডোরে’। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে শত শত যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে চড়ে ঢাকার পথে ছুটছেন। প্রশাসনের সতর্কতা, মাইকিং সবকিছুই এখানে অকার্যকর।

ময়মনসিংহ নগরীতেই গত দুই দিনে ছাদ থেকে পড়ে দুই যাত্রীর মৃত্যু হলেও থামেনি এই আত্মঘাতী যাত্রা; বরং দিন দিন তা আরো বেপরোয়া রূপ নিচ্ছে, যা রেল ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

গতকাল সোমবার ঈদের পঞ্চম দিনে ময়মনসিংহ ও গৌরীপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্ম-জুড়ে মানুষের ঢল। ট্রেন স্টেশনে ঢোকার আগেই যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বগিতে ওঠার জন্য। ভেতরে জায়গা না পেয়ে কেউ দরজায় ঝুলছেন, আবার কেউ নির্দ্বিধায় উঠে পড়ছেন ছাদে। এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুদের উপস্থিতিও উদ্বেগজনক।

সবচেয়ে দুঃখজনক চিত্র- টিকিট কেটেও অনেক যাত্রী ট্রেনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তারা ছাদ কিংবা দরজায় ঝুলেই যাত্রা শুরু করছেন। এক দিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, অন্য দিকে ট্রেনের সময়সূচির ভয়াবহ বিপর্যয় সবমিলিয়ে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক ট্রেন এক থেকে তিন ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

যাত্রীদের ক্ষোভ স্পষ্ট ‘টিকিট নিয়েও উঠতে পারছি না। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। অফিস শুরু হচ্ছে, না গেলে চাকরি যাবে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ফিরছি।’

এ দিকে মাইকিং করে সতর্ক করছে রেলওয়ে পুলিশ; কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রভাব নেই। ময়মনসিংহ জিআরপি থানার ওসি মো: আকতার হোসেনের বক্তব্য- ‘অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে ছাদে ভ্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না’।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘অতিরিক্ত চাপ’ কি নতুন? প্রতি ঈদের পর একই চিত্র দেখা গেলেও কেন নেই কার্যকর পরিকল্পনা? কেন বাড়ানো হয় না ট্রেন সংখ্যা? কেন নেই ছাদে যাত্রী ওঠা ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা?

অন্য দিকে ঘন ঘন ইঞ্জিন বিকল, এমনকি ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলেছে। এতে ট্রেন চলাচল বিঘিœত হচ্ছে, বাড়ছে বিলম্ব, আর আতঙ্কে থাকছেন যাত্রীরা।

স্টেশন-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাপ্তাহিক ছুটির কারণে কয়েকটি ট্রেন বন্ধ থাকায় সীমিতসংখ্যক ট্রেনেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। স্বল্প খরচে ঢাকায় ফেরার একমাত্র ভরসা হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত যাত্রীরা ঝুঁকি জেনেও ট্রেনের ছাদে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাস্তবতা হলো ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেলব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। যাত্রীনিরাপত্তা আজ উপেক্ষিত, আর দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতায় ‘মৃত্যুর মিছিল’ যেন হয়ে উঠছে নিত্যদিনের দৃশ্য।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের সুপার আব্দুল্লাহ আল হারুন জানিয়েছেন, ট্রেনের ছাদে যাত্রী ভ্রমণ ঠেকাতে জিআরপি ও আরএনবি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ছাদের যাত্রীদের নামিয়ে দিলে তাদের গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই মানবিক দিক বিবেচনায় অনেকসময় বাধ্য হয়ে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়।