এসপিএম টেন্ডার নিয়ে তোলপাড়

স্বচ্ছতা সঙ্কট প্রতিযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ রি-টেন্ডারের দাবি

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল অভিযোগ তুলেছে, এই দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দরপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে এই সময়টি ছিল জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন পর এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথের দিন, যা অনেকের মতে একটি ‘স্পর্শকাতর সময়’। এই প্রেক্ষাপটে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে অস্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা।

অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনের কারণ : তথ্য অনুযায়ী, মোট ১১টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র ক্রয় ও প্রি-বিড মিটিংয়ে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেয়। এটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরপত্র আহ্বানের সময়সূচি নির্বাচনকালীন অস্থিরতার সাথে মিলে যাওয়ায় বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পায়নি। ওই সময় ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধা স্থগিত ছিল এবং বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সরে দাঁড়ানো : দরপত্রের প্রি-বিড মিটিংয়ে অংশ নেয়া নেদারল্যান্ডসের বিশ্বখ্যাত কোম্পানি ঝসরঃ খধসহধষপড় এবং মিসরের গধৎরফরাব চূড়ান্ত পর্যায়ে অংশ নেয়নি।

ঝসরঃ খধসহধষপড় বিশ্বব্যাপী ২২টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ঝচগ পরিচালনায় সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে গধৎরফরাব কাতারসহ বিভিন্ন দেশে বড় বড় জ্বালানি প্রকল্পে কাজ করেছে। উভয় কোম্পানিই দরপত্র জমার সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেছিল, এমনকি কূটনৈতিক পর্যায় থেকেও সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সময় বাড়ানো হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে।

সীমিত অংশগ্রহণ ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান : শেষ পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান- ইন্দোনেশিয়ার চবৎঃধসরহধ, চীনের ঈযরহধ চবঃৎড়ষবঁস চরঢ়বষরহব (ঈচচ) এবং ঐরষড়হম। এই তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই দেশে-বিদেশে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি উঠেছে।

চবৎঃধসরহধ-এর বিরুদ্ধে নিজ দেশে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের কিছু সাবেক কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঈচচ পূর্বে ঝচগ প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ (ঊচঈ) সম্পাদন করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচিত হয়েছে। এমনকি মালয়েশিয়ায় তাদের একটি বড় পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ঐরষড়হম-এর বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চবঃৎড়ঝঅ-এর সঙ্গে একটি বিতর্কিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন : বিশেষজ্ঞদের একটি বড় উদ্বেগ হলো- ঈচচ একই প্রকল্পে আগে ঊচঈ কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেছে, এখন আবার ঙ্গ কাজের দরপত্রে অংশ নিচ্ছে। এতে স্বার্থের সঙ্ঘাত (পড়হভষরপঃ ড়ভ রহঃবৎবংঃ) তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ঈচচ মূলত নির্মাণ কাজে দক্ষ হলেও দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত, যা এই প্রকল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

সিন্ডিকেট ও অতীতের ছায়া : সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি খাতে যে সিন্ডিকেট-নির্ভর কার্যক্রম গড়ে উঠেছিল, বর্তমান দরপত্র সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়, এমন অভিযোগও উঠেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে প্রকল্পের গুণগত মান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা সব কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় সম্ভাব্য ঝুঁকি : ঝচগ প্রকল্পটি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি জ্বালানি খালাস করা হয়। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের অদক্ষতা বা দুর্নীতি দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভুল কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হলে অপারেশনাল ব্যর্থতা, দুর্ঘটনা বা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রি-টেন্ডারের জোর দাবি : এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা বর্তমান দরপত্র বাতিল করে নতুন করে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ ‘রি-টেন্ডার’ আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করলে ঝসরঃ খধসহধষপড় বা গধৎরফরাব-এর মতো অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করতে পারবে, যা প্রকল্পের মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।

তদন্তের আহ্বান : এ দিকে, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা পড়েছে। অভিযোগে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সময়সীমা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসপিএম প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে যদি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে তা শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এখনই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।