মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির শতাধিক নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাজনীতির মাঠে ও দলের ভেতরে অনেকটা কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছেন এ দলছুট নেতারা। অধিকাংশই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে দলের হাইকমান্ড বরাবর আবেদন করেছেন। তাদের আশা, এর আগে দলের চেয়ারপারসনকে মাইনাস করা বা দল ভাঙার সাথে জড়িতদেরও বিএনপিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের অনেকেই বর্তমান সংসদের এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। তবে দলের হাইকমান্ড এখনো এসব নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যদিও দলের অনেকেই এসব নেতার এলাকায় অবস্থান এবং দলে তাদের অতীত ভূমিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পক্ষে রয়েছেন। এমন অবস্থায় বহিষ্কৃত নেতাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মাঠে পরাজয়, দলে অনিশ্চিত প্রত্যাবর্তন-দুই চাপে বিদ্রোহীদের রাজনীতি এখন দোলাচলে।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রথম দিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র জমা দেন অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা। পরবর্তীকালে দলীয় নির্দেশনা মেনে বেশির ভাগ নেতা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তবে দলের কঠোর অবস্থান মানেননি অনেক হেভিওয়েট নেতা। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত লড়েছেন। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। এমনকি তাদের পে অবস্থান নেয়ায় সারা দেশের সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ দিকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে যেসব মিত্ররা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটে হেরেছেন, তাদের কেউ কেউ আগের দলে ফিরতে চান। নির্বাচনে ধরাশায়ী বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী অনেকেই জানান, এ শোচনীয় হারের পর তাদের অনেকেই এখন দিশেহারা। তারা বুঝতে পেরেছেন, দলের প্রতীকের বাইরে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক খুবই সামান্য। তাই ভুল স্বীকার করে আবারো বিএনপিতে ফিরতে চাইছেন তারা। যোগাযোগ করছেন দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে। চাইছেন সাধারণ মা ও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার।
সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মূলত বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ কারণে ভোটের আগেই দল থেকে বহিষ্কার হন। ধারণা করা হয়েছিল, নির্বাচনের পর জয়ী স্বতন্ত্রদের দলে ফিরিয়ে নেয়া হবে; কিন্তু সরকার গঠনের পর তাদের এখনো দলে নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সাবেক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ছাড়া বাকিরা সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের সাথে সঙ্গতি রেখে এদের বিভিন্ন বিলে হ্যাঁ-এর পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনের এমপি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, আমরা সাতজন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হলেও সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। আপাতত স্বতন্ত্র ছয় এমপি জোটবদ্ধভাবে কাজ করছি। আর ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছেন। তিনি বলেন, দলের প থেকে স্বতন্ত্র এমপিদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরাও এ েেত্র নিজস্ব অবস্থান থেকে এগোতে চাই। সাধারণ মানুষের পে ভূমিকা রাখাই আমাদের একমাত্র ল্য। আমরা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আবেদনও করেছি। এখন দল চাইলে ফিরতে চাই।
সূত্র মতে, নির্বাচনের আগে দলের মনোনীত প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করেন বিএনপির শতাধিক প্রার্থী। এতে করে তারা বহিষ্কার হন। যদিও ভোটের লড়াইয়ে সাতজন জয়ী হন। তারা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার নিকটতম ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ওবায়দুল হক। কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় দলের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেয়া সৈয়দ এহসানুল হুদা। চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আব্দুল হান্নান। উপজেলা বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির হারুন উর রশীদ। কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আতিকুল আলম (শাওন)। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এলডিপির মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেয়া রেদোয়ান আহমেদ। ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে জয়ী হন সালমান ওমর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। দলীয় নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনের আগেই ময়মনসিংহ উত্তর জেলার সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার হন সালমান ওমর। দিনাজপুর-৫ আসনে জয়ী হন এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল আহাদ। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এ কে এম কামরুজ্জামান।
এসব সংসদ সদস্যরা জানান, তারা দল এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছেন। তারা দলে ফিরতে চান। তাদের প্রত্যাশা দল তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনের এমপি সালমান ওমর বলেন, স্বতন্ত্র এমপিরা ফিরতে চান। সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে নিজেদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। দলীয় হাইকমান্ডের প থেকে এ বিষয়ে আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে জানান।
এ দিকে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হওয়া অধিকাংশ নেতাই দলে ফিরতে তৎপরতা শুরু করেছেন। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিষয়ে আপাতত কঠোর অবস্থানে বিএনপি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীরা এখনই দলে ফেরার সুযোগ নেই। তবে আগামী কাউন্সিলের পর দল তাদের ফিরিয়ে নেবে, এমনটি একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম তারা (বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা) যেন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন না করেন। তারা যেন ভোটের মাঠে দলীয় প্রার্থীর পে কাজ করেন। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা তারা রাখেননি। এখন ফিরতে চাচ্ছেন, দেখা যাক কী করা যায়। এখনো দলীয় ফোরামে এসব নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে তিনি জানান।
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) ঢাকা-১৪ আসনে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে হেরেছেন। এখন ফিরতে চান তার পুরোনো ঠিকানায়। তিনি বলেন, আজীবন বিএনপির সঙ্গে রাজনীতি করেছি। এখন দল যদি পুনর্বিবেচনা করে, তাহলে দলের জন্য কাজ করব।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক (বহিষ্কৃত) তাইফুল ইসলাম টিপু। নাটোর-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে তিনিও পরাজিত হয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করেছে। আদর্শিক কিংবা নীতিগত জায়গা থেকে আমি বিএনপিতেই আছি। দল যদি মনে করে আমাদের কাজে লাগাবে, তাহলে সেটি করতে পারে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বহিষ্কৃতদের দলে ফেরাতে তারা ইতিবাচক। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দলের দুর্দিনে অনেকেই রাজপথে ছিলেন। এখন যদি তাদের দলে ফেরানো না হয় তাহলে অনেকেই অণ্য দলে যোগ দিবেন। এতে করে তাৎক্ষণিক দলের ক্ষতি বুঝা না গেলেও ভবিষ্যতে এর একটি প্রভাব পড়বে। তারা উদাহরণ দিয়ে বলছেন, এর মধ্যে রাজধানীতে একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়েছেন। জানা গেছে, আরও কয়েকজন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা অন্য দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নির্বাচনের সময় বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানো নিয়ে বিএনপিতে দুই ধরনের মত রয়েছে। দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। তবে অন্য একটি পরে মতে, যারা দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মানেননি, তাদের শাস্তির আওতায় রাখা প্রয়োজন। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিষয়টি এখন সংবেদনশীল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দলের এই অংশটি মনে করে বিদ্রোহের রাজনীতি উৎসাহিত হলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা বলেন, বড় দলগুলোর েেত্র বিদ্রোহী রাজনীতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলকে শক্তিশালী রাখতে হলে শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে নেয়া প্রয়োজন।



