নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর গাজা ও মিসরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংটি একটি ‘পাইলট অপারেশন’ বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় আংশিকভাবে খুলে দিয়েছে দখলদার ইসরাইল। আজ সোমবার থেকে এই সীমান্ত দিয়ে উভয়মুখী যাতায়াত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের বরাতে জানিয়েছে টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিদিন গাজা থেকে প্রায় ১৫০ জন বাসিন্দা বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বিপরীতে প্রায় ৫০ জন গাজায় প্রবেশ করতে পারবেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী রাফাহ ক্রসিং দখল করার পর থেকে এটি মূলত বন্ধ ছিল, যা গাজার বেসামরিক নাগরিকদের জীবনযাত্রা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
ফিলিস্তিনি বেসামরিক বিষয়ক সমন্বয়কারী ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্থা কোগাট নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমানে শুধু নির্দিষ্ট বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য ক্রসিংটি খোলা হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত খোলার অপেক্ষায় বর্তমানে প্রায় ২০০ জন রোগী জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অনুমতি পাওয়ার আশায় রয়েছেন। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে যুক্ত অন্তত ৪০ জন কর্মকর্তার একটি দল গাজায় তাদের কার্যক্রম শুরু করার জন্য মিসরীয় অংশে পৌঁছেছেন।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই ক্রসিং খোলার বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশনের তত্ত্বাবধানে এবং মিসরের সাথে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে ইসরাইল শর্ত দিয়েছিল, গাজায় বন্দী থাকা সর্বশেষ ইসরাইলি সেনা রান গভিলির লাশ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা সীমান্ত খুলবে না। সম্প্রতি তার লাশ উদ্ধার ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর কোগাট এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংস্থাটি এই পদক্ষেপকে একটি ‘প্রাথমিক পরীক্ষামূলক পর্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি চলছে বলেও জানিয়েছে। এ দিকে জাতিসঙ্ঘ এই ক্রসিংটি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্যও উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে, যা গাজার বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তাকর্মীরা বর্তমানে সীমান্তে বিভিন্ন বাধা ও পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও নিয়মিত সহিংসতার খবরের মধ্যে এই সীমান্ত খোলার সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও পূর্ণাঙ্গ চলাচলের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা বাকি।
গতকাল রাফাহ দিয়ে গাজাবাসীর যাতায়াত নয়
ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ এর বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, রাফাহ সীমান্ত খুললেও গতকাল গাজার বাসিন্দারা এটি ব্যবহার করতে পারেন নাই। নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সিস্টেম পরীক্ষা ও প্রাথমিক অপারেশন মডেল চালু করা হচ্ছে। ইসরাইলি সংস্থা সিওজিএটি জানায়, কেবল সেই ফিলিস্তিনিরাই গাজায় ঢুকতে পারবেন যারা যুদ্ধের সময় এলাকা ছেড়েছিলেন এবং পূর্বানুমোদন পেয়েছেন। মিসরের অনুরোধে কেবল অসুস্থ ও আহতদের বের হতে দেয়া হবে। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন যাতায়াত করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। ফলে রাফাহ খুললেও দিনে মাত্র ১৫০ জন বের হতে পারলে প্রায় ২০ হাজার আহত ও অসুস্থ ফিলিস্তিনিকে বিদেশে পাঠাতে তিন বছর লেগে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। ফলে পূর্ণ সক্ষমতায় না চললে মানবিক সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় অব্যাহত ইসরাইলি হামলা
রাফাহ সীমান্ত পরীক্ষামূলকভাবে খোলার ঘোষণার মধ্যেই গাজায় ফের হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। গাজার মধ্যাঞ্চলের ওয়াদি গাজা এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুইজন আহত হয়েছেন বলে আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল সূত্রে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। এই হামলা এমন এক দিনের পর ঘটল, যখন যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজাজুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলায় ৩০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। প্রত্যক্ষ দর্শীরা জানান, উত্তর ওয়াদি গাজায় একটি বেসামরিক এলাকায় অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এই এলাকাটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। এ ছাড়া, গাজা সিটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিস্ফোরণ ও ভারী গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে রাফাহর পশ্চিমে, বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গুলি ছোড়া হয়। গাজার উত্তরের উপকূলে ইসরাইলি নৌবাহিনীও গোলাবর্ষণ করেছে বলে জানা গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৫০৯ জন নিহত এবং ১৪০৫ জন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে।
এমএসএফ নিষিদ্ধ, গাজায় চিকিৎসা সঙ্কট আরো গভীর
গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। সংস্থাটি তাদের ফিলিস্তিনি কর্মীদের তালিকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলের ডায়াসপোরা বিষয়ক ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবেলা মন্ত্রণালয়। খবর আলজাজিরার।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, গাজায় কাজ করা সব মানবিক সংস্থার জন্য স্থানীয় কর্মীদের তালিকা দেয়া বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা উদ্বেগ ও তথ্য কিভাবে ব্যবহৃত হবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা না পাওয়ায় এমএসএফ তালিকা দিতে রাজি হয়নি। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এমএসএফকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গাজা ছাড়তে হবে। তবে ত্রাণ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এতে গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হবে এবং ত্রাণ কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৭০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন এমএসএফ কর্মী রয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা গাজায় চিকিৎসা সেবার শেষ অবলম্বনগুলোও ধ্বংস করে দেবে।
ফেরার আশায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি, ২২ হাজার আহতের বিদেশে চিকিৎসা জরুরি
ইসরাইলের যুদ্ধের সময় গাজা ছাড়তে বাধ্য হওয়া প্রায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি এখন নিজ ভূখণ্ডে ফিরে আসতে চান বলে জানিয়েছেন গাজার মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, একই সাথে প্রায় ২২ হাজার আহত ও গুরুতর অসুস্থ মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার জরুরি প্রয়োজনের মুখে রয়েছেন। রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়ের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সেখানে চলাচল তদারক করবে একাধিক পক্ষ। আল-থাওয়াবতা জানান, যুদ্ধবিরতির পরও চিকিৎসা সুবিধা সীমিত থাকায় আহতদের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গাজায় দেয়া সম্ভব না হওয়ায় রাফাহ সীমান্ত খোলা তাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী হয়ে উঠতে পারে। তবে সীমান্তে চলাচল কিভাবে পরিচালিত হবে, কারা অগ্রাধিকার পাবে- সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। ফলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ায় আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ দিকে আহত ও অসুস্থদের জরুরি চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা না হলে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের পরিচালক ডা: মুহাম্মদ আবু সালমিয়া। তিনি বলেন, ‘গাজায় প্রায় ২২ হাজার মানুষ, যার মধ্যে ৪৫০০ শিশু, বিদেশে চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। আগের প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বহু রোগী বছরের পর বছর অপেক্ষায় মারা যেতে পারেন’।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে ইউরোপজুড়ে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের সমর্থনে ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের অব্যাহত হামলার প্রতিবাদ জানান তারা। সেই সাথে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার জন্য ইউরোপীয় সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা। খবর বার্তা সংস্থা আনাদোলুর।
ব্রিটেনে ফিলিস্তিনের পক্ষে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী লন্ডনের রাসেল স্কয়ারে জড়ো হয়ে হোয়াইট হলের দিকে মিছিল নিয়ে যান, যেখানে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন অবস্থিত। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের চলমান গণহত্যার প্রতিবাদ জানান। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানান এবং ইসরাইলে অস্ত্র রফতানি অব্যাহত রাখায় ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করেন বিক্ষোভকারীরা।
ফিলিস্তিনি পতাকা ও প্লাকার্ড বহন করে বিক্ষোভকারীরা ইসরাইল ও ব্রিটেন সরকারের বিরুদ্ধে সেøাগান দেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কোম্পানিগুলোকে ইসরাইলের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান তারা। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য জারাহ সুলতানা এবং জন ম্যাকডোনেল তাদের সাথে মিছিলে যোগ দেন। এ দিকে, সুইডেনে গাজায় ইসরাইলের আক্রমণ ও মানবিক সাহায্য সরবরাহে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে শত শত বিক্ষোভকারী রাজধানী স্টকহোমে জড়ো হন। বিক্ষোভে অংশ নেন এক লাখের বেশি মানুষ, যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘পিস কাউন্সিল’ প্রত্যাখ্যান করেন। বিক্ষোভকারীরা বলেন, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে ইসরাইল। সেই সাথে গাজায় বিমান হামলা এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশ সীমিত করায় ইসরাইলের সমালোচনা করেন তারা। বিক্ষোভকারীরা সুইডিশ সরকারের কাছে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানান। অক্টোবরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে, ইসরাইলি অভিযানে ৫২৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।



