আলি জামশেদ, বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এ সময়টায় সাধারণত বোরো ধান ঘরে ওঠার আনন্দ আর কোরবানির পশু প্রস্তুতির ব্যস্ততা থাকার কথা। কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পচে গেছে ধানের খড়ও। ফলে গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য খড় সংগ্রহ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে অল্প দামে নিজেদের লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষক ও খামারিরা। এতে একদিকে যেমন পরিবারে নেমে এসেছে হতাশা, অন্য দিকে আসন্ন কোরবানির বাজারেও পশুর সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা ও গরুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। কৃষক ও খামারিদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, ধান বিক্রি করে লোকসান, আবার গবাদি পশু পালনের মতো পরিস্থিতিও নেই।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, এ বছর বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে শুধু ফসলই নয়, ধানের খড়ও নষ্ট হয়েছে। সাধারণত ধান কাটার পর সেই খড় সারা বছর গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এবার খড়ের সঙ্কট দেখা দেয়ায় পশু পালন অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
কিশোরগঞ্জের বৃহৎ জোয়ান শাহী হাওরের ছাতিরচর এলাকার কৃষক শহীদ মিয়া, সাবেক ইউপি সদস্য রেশম মিয়া ও তাদের স্বজনরা বলেন, ধানহানির কারণে ঋণের চাপ বেড়েছে। অনেকেই এবার কোরবানি দেয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ঈদের আনন্দও অনেকটা ম্লান হতে চলেছে তাদের।
জোয়ান শাহী হাওরের বাথানে পশুপালনের সাথে যুক্ত ছাতিরচরের নজরুল ও জামালসহ কয়েকজন খামারি বলেন, তারা কোরবানির জন্য মাংসজাত গরু প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু ধান তলিয়ে যাওয়া এবং ঘাসের জমি ডুবে যাওয়ায় পশু খাদ্যের অভাবে পশু পালন বড় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই কম দামে গরু বিক্রি করে দিতে হয়েছে। তাদের ভাষ্য, আধাপাকা ধান পানিতে ডুবে যাওয়ার পর তা তুলতে দ্বিগুণের বেশি মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে। এরপরও আবহাওয়ার কারণে ধানের মান নষ্ট হওয়ায় বাজারে আশানুরূপ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
গত ১৩ মে জেলার অন্যতম বড় সাজনপুর-আঠারবাড়িয়া গরুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার উপস্থিতি বেশি। হাটের যুগ্ম ক্যাশিয়ার আনোয়ার হোসেন, জসীম উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস ছোবান বলেন, এ সময় সাধারণত হাটে লেনদেন বেশি হওয়ার কথা থাকলেও এবার পরিস্থিতি উল্টো। সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ও অনেক কমে গেছে এবার।
ছাতিরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও পাহাড়ি ঢলে কাঁচাপাকা ধানের বড় অংশ তলিয়ে গেছে। পরে অতিরিক্ত খরচে ধান তোলা হলেও মান নষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষক কম দামে বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি ধান তোলার খরচ জোগাড় এবং গোখাদ্যের সঙ্কটে অনেকেই গবাদি পশু বিক্রি করে দিয়েছেন।
নিকলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: আবু হানিফ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার গোখাদ্যের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ধানের খড় না পাওয়ায় ক্ষুদ্র খামারি ও প্রান্তিক কৃষকরা ঈদের আগেই অনেক পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে অর্থাভাবে এবার কোরবানি দিতে পারা মানুষের সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।



