- স্থায়িত্ব আর সুযোগ-সুবিধাই প্রাধান্য
- চাকরির নিরাপত্তাহীনতাই বেসরকারিতে আগ্রহ কম
মহিউদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পড়াশোনা করছেন, লক্ষ্য একটি ভালো গ্রেডের সরকারি চাকরি। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি চাকরি নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নির্দিষ্ট বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব, পেনশন সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা সবমিলিয়ে এটি এখনো অধিকাংশ তরুণের প্রথম পছন্দ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারে সরকারি চাকরি যেন একটি স্বপ্নের নাম, যা অর্জন করাকে জীবনের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে যখন একজন তরুণ বাস্তব জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ায়, তখন একটি সরকারি চাকরি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে জানিয়ে তিনি বলেন, এই স্বপ্নের পথে যাত্রা সহজ নয়। সীমিত সংখ্যক পদ, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির কারণে অনেক তরুণকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে, যা কখনো কখনো মানসিক চাপ ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সরকারি চাকরি নিরাপত্তার প্রতীক, আর বেসরকারি চাকরি সম্ভাবনার। একটি আমাদের ভবিষ্যৎকে স্থির করে, অন্যটি আমাদের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করে।
শুধু মহিউদ্দিন আহমেদ নয়, তার মতো প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে পড়াশোনা শেষ করে একটি সরকারি চাকরি করবে। বাংলাদেশে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির দিকেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে। বিসিএস থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য লাখ লাখ শিক্ষার্থী লড়াই করে। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বেসরকারি চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়ায় সরকারি চাকরির স্থায়িত্ব ও সামাজিক মর্যাদাকেই তরুণরা নিরাপদ মনে করছে। সরকারি চাকরিতে কয়েক শ’ বা হাজার পদের বিপরীতে কয়েক লাখেরও বেশি প্রার্থী আবেদন করছেন, যা সরকারি চাকরির প্রতি অদম্য আগ্রহের প্রমাণ দেয়। বিআইডিএসের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার চড়া।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও জাতীয় জাদুঘরের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা করছেন ভালো মানের একটি সরকারি চাকরির জন্য। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভালো বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, অবসরকালীন সুবিধা এসব কারণে সরকারি চাকরি তাদের প্রথম পছন্দ। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, পদ সীমিত। তবে অনেক শিক্ষার্থী বেশি বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা, নানা ধরনের ঋণসুবিধা থাকায় ব্যাংকের চাকরির দিকে ঝুঁকছে।
তবে সরকারি চাকরি বা বেসরকারি চাকরি, দুটোই এখন তরুণদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছে দেশের লাখো তরুণ-তরুণী। বিসিএস থেকে শুরু করে যেকোনো গ্রেডের সরকারি চাকরি পরীক্ষার জন্য মাত্র কয়েকটি সিটের জন্য লড়ে প্রায় লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী, যেখানে পাসের হার দাঁড়ায় মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ। বাকিদের শূন্য হাতেই ফিরতে হয়। সরকারি চাকরি ছাড়াও বেসরকারি চাকরিতেও এখন বেশ প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। একটি বা দুইটি পদের জন্য যেকোনো চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেয়া মাত্রই জমা পড়ে শত শত আবেদন। সেই কারণেই ব্যর্থতার হার এর তুলনায় সফলতার হার অতি নগণ্য।
সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী বেসরকারি খাতে বা উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। বেসরকারি ব্যাংকিং, বহুজাতিক কোম্পানি এবং যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানেও কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তবে সেখানেও অনেক প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে।
এ দিকে ভিন্ন মতপ্রকাশ করে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মো: ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, বেসরকারি চাকরিতে মানুষ নিজের মেধা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এখানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হয়, আর সেই চলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে উন্নতির সোপান। সরকারি চাকরির মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা নয় এখানে যোগ্যতাই হয়ে ওঠে সাফল্যের চাবিকাঠি। এখানে পরিশ্রমের মূল্য তৎক্ষণাৎ প্রতিফলিত হয় উচ্চ বেতন, বোনাস, আর নানা সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে। প্রতিটি দিন যেন নতুন কিছু শেখার আহ্বান, নতুন অভিজ্ঞতার দোরগোড়া। আধুনিক পরিবেশ, প্রযুক্তির ছোঁয়া, আর প্রতিযোগিতার উত্তাপ মানুষকে করে তোলে আরো দক্ষ, আরো সক্ষম। বেসরকারি চাকরি শুধু জীবিকা নয়, এটি যেন এক চলমান যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। তাই মনে হয় জীবনের গতি, চ্যালেঞ্জ ও দ্রুত সাফল্যের স্বাদ খুঁজতে বেসরকারি চাকরি এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন। এর বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের মতো। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে তরুণেরা। তবে যত তরুণ বাজারে ঢুকে তার অর্ধেকও চাকরি পায়নি। গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পাননি। ফলে একটি বড় অংশ কর্মহীন থেকে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪-২৫ এর জরিপে দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ সরকারি চাকরি সম্পর্কিত তথ্য সবচেয়ে বেশি খোঁজেন। জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অনলাইনের মাধ্যমে সরকারি সেবা গ্রহণ করেছেন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৪-এর এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৮৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পরিচালিত এই জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেন। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৩ দশমিক ১৩ শতাংশ সরকারি চাকরি করতে চান। তবে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষিত বেকারের ওপর করা ভিন্ন ভিন্ন সমীক্ষায় এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের ওপরেও দেখা গেছে, বিশেষ করে যখন তারা বিসিএস বা প্রথম শ্রেণীর চাকরির প্রতি ঝোঁকেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারি চাকরির যেসব পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার চাহিদা অষ্টম শ্রেণী পাস, সেগুলোতে এখন এসএসসি বা এইচএসসি পাস ব্যক্তিরা আবেদন করছেন। আবার এসএসসি বা এইচএসসি পাস চাওয়া হলে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস ছেলেমেয়েরা আবেদন করছেন। মৌখিক পরীক্ষায় তারা নিচু পদে আবেদনের কারণ হিসেবে সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার কথা বলেন। সরকারি চাকরিতে এত ঝোঁক মোটেই ইতিবাচক নয়। বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান না হলে শিক্ষিত বেকারত্বের মোকাবেলা করা যাবে না। পরিণতিতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন আর সামাজিক শৃঙ্খলা পদে পদে ঠেকে যাবে। উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরেও জোর দিতে হবে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে অনেক সময় চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, কম বেতন ও অনিশ্চিত পরিবেশ তরুণদের হতাশ করে তোলে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আজাদ খান বলেন, সবাই মনে করে সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা আছে, তা ছাড়া চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কাও কম। এই ধারণা থেকেই সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। অন্য দিকে বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এসব নিশ্চিয়তাগুলো অত্যন্ত সীমিত। তবে কিছু কোম্পানি এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। সরকারি চাকরির দিকে ঝোঁকার অন্যতম কারণ হলো বিভিন্ন অবৈধ লেনদেন ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা। অনেকে মনে করেন এসব চাকরিতে অল্প সময়ে অধিক অর্থের মালিক হওয়া যায়। কারণ সরকারি চাকরিতে খুব একটা জবাবদিহি করতে হয় না।
সবাই সরকারি চাকরির দিকেই কেন ঝুঁকছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশে মূলধন পাওয়ার বড় সঙ্কট রয়েছে। অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা করে। তবে বিনিয়োগ করার মতো মূলধন পাচ্ছে না। পেতে গেলে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় বাজারে টিকতে না পেরে সর্বস্ব হারিয়ে হতাশ হতে হয়। এতে করে সরকারি চাকরির দিকেই ঝুঁকছে সবাই। তা ছাড়া বেসরকারি চাকরিকেও তারা নিরাপদ মনে করছেন না। তবে সরকারের উচিত সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষিতদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা। এসব লোকজন যেন উদ্যোক্তা হতে পারে সেজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ও মূলধন দিয়ে সহায়তা করা।



