পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস অংশে আসছে বড় পরিবর্তন

নতুন শিক্ষাবর্ষের পাণ্ডুলিপি সংশোধনে কর্মশালা

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসছে। ইতিহাস অংশে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন নতুন অধ্যায়। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নতুন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরে বগুড়ায় গত সপ্তাহে চার দিনের একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখামে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নানা দিক তুলে ধরার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে আজ মঙ্গলবার থেকে প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়েও বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডার বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হতে পারে। বর্তমানে পাঠ্যবইয়ে (২০২৫ এবং ২০২৬ সালের) যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই কাটছাঁট করা হতে পারে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শিক্ষাবর্ষে যুক্ত হওয়া ২০২৪ এর জুলাইয়ের হাজারো শাহাদাতের ঘটনা এমন কি গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিও কাটছাঁট হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসসংক্রান্ত বইয়ের পাতায় নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। কেননা ২০০৯ সালের পর থেকে ২০২৬ সালে পর্যন্ত বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী আমলে পাঠ্যবইয়ের বেশ কিছু অংশজুড়েই ছিল ব্যক্তি বন্দনা ও দলীয় নানান বিষয়ের ফিরিস্তি। এবার গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পাঠ্যবইয়ে নতুন করে তাদের দলীয় প্রধান বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী ও তাদের কর্মময় জীবন পাঠ্যবইয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নতুন পাঠ্যবই সেভাবেই পরিমার্জন করা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, পাঠ্যবইয়ে এবার ইতিহাস ও দক্ষতাভিত্তিক বিষয়গুলোতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ে নতুন কিছু বিষয় সংযোজনের পাশাপাশি কয়েকটি বইয়ে ব্যাপক পরিমার্জন করা হচ্ছে।

গত ৩,৪,৫,৬ মে বগুড়ায় পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জন বিষয়ে চার দিনের নানা কর্মশালায় পাঠ্যবইয়ে কি কি বিষয় যুক্ত করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কর্মশালায় উঠে আসে ইতিহাস বিষয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভূমিকা নতুন করে যুক্ত করার বিষয়ে সবার মতামত। একই সাথে আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়িয়ে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ও পুরনো বই পরিমার্জন বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণীতে আনন্দময় শিক্ষা এবং চতুর্থ শ্রেণীতে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণীর কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষাবিষয়ক বইয়ে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে ব্যাপক পরিমার্জন করা হচ্ছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তাই দেশের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকেই পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জন করা হবে এটাই স্বাভাবিক। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী টানা তিন দিন এনসিটিবিতে অফিস করে কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনিই মূলত জানিয়েছেন এবারের নতুন পাঠ্যবইয়ে কী কী বিষয় থাকবে, কী কী বিষয় বাদ দেয়া হবে। ইতোমধ্যে সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়েছে। এখন বিষয়বস্তু, উপস্থাপন ও শ্রেণীভিত্তিক বিন্যাস চূড়ান্ত করা হচ্ছে। নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়ের সাথে মিল রেখে বইগুলো পরিমার্জন করা হচ্ছে।

অবশ্য এর আগে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পলায়নের কারণে পাঠ্যবইয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেই বই ছিল ২০১২ সালের কারিকুলামের আলোকে প্রণীত। তবে সেই বইয়েও আনা হয়েছিল কিছু পরিবর্তন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের পঞ্চম থকে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য সংযোজন করা হয়। পরে চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তুও রয়েছে তাতে। তবে এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র এক বছর আগের পাঠ্যবইয়েও নতুন করে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চার দিনব্যাপী কর্মশালার মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরে বিভিন্ন শ্রেণীর ৯৯টি বই পরিমার্জন করা হয়েছে। আজ থেকে প্রাথমিক স্তরের ৩৬টি বই পরিমার্জনের কাজ শুরু হচ্ছে। তবে এসব পরিমার্জন কেবল আগামী বছরের বইয়ের জন্যই। ২০২৮ সাল থেকে নতুন কারিকুলামের বই পাবে শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের পরিকল্পনা হলো, ২০২৮ সাল থেকে নতুন করে একটি শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু করা। এই শিক্ষাক্রম প্রণয়নের রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। তবে এখন পাঠ্যবইয়ের যে পরিমার্জন হচ্ছে সেখানেও অনেক বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো: মাহবুবুল হক পাটওয়ারী (অতিরিক্ত দায়িত্বে) জানান, শিক্ষাক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ে সময়ে এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতি বছরই এর কিছু সংযোজন কিংবা পরিমার্জন হয়। এবার যেহেতু নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিশ্রুতি বিবেচনা করে পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জনের কাজটি করা হচ্ছে। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় দেশের প্রায় ৩২০ জন শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ নিয়ে কর্মশালার মাধ্যমে কাজটি করা হচ্ছে। মাধ্যমিকের বইয়ের জন্য গত সপ্তাহে একটি কর্মশালা শেষ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার থেকে প্রাথমিকের বইয়ের পরিমার্জনের আরো একটি কর্মশালা শুরু হচ্ছে।