মধ্যনগরে ইজারাকৃত বিল শুকিয়ে অবাধে মাছ নিধন

Printed Edition
কৈজোড়া বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত
কৈজোড়া বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত

আব্দুল আউয়াল মিসবাহ মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)

সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের চামড়দানি ও বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের একাধিক ইজারাকৃত বিল আইন অমান্য করে সম্পূর্ণ শুকিয়ে অবাধে মাছ নিধন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ ও মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ধ্বংসের মুখে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় জেলে, কৃষক ও সাধারণ মানুষ।

সরেজমিন দেখা যায়, চলতি মৌসুমে হরিবন (আরিবন) খানি, লুসনি, বড় মেধা, ছোট মেধা, বোয়ালা, কইয়ারকুরি, লুংগা-তুংগা, ইয়ারন বিল এবং কাইলানি হাওরের কৈজোড়া বিলসহ বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক জলাশয় বিভিন্ন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারা নেয়া আছে। বর্তমানে শুকনো মৌসুমে এসব ইজারাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং স্থানীয় কিছু জেলেকে কাজে লাগিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

এখন তারা ধাপে ধাপে সেসব ইজারাকৃত বিল সেচের মাধ্যমে পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করছে। বিল শুকিয়ে তারা ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, পোনা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচারে নিধন করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এভাবে বিল শুকিয়ে মাছ ধরার ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ দ্রুত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। একই সাথে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

মৎস্য আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানি সম্পূর্ণ সেচে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ। কারণ এভাবে মাছ নিধন করলে তা পরিবেশে ও মৎস্যকুল উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সচেতন মহলের আশঙ্কা, প্রতিবছর এভাবে ইজারাকৃত বিল শুকিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্থানীয় জেলেরা সঙ্কটে পড়বেন এবং এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মিঠা পানির মাছও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

চামড়দানি ও বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের বিলপাড়ের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন, তৌফিক, আলামিন, মাসুম ও সাদিকুলসহ অনেকে বলেন, এই বিলগুলো আমাদের বংশপরম্পরায় জীবিকার প্রধান উৎস। এখন পুরো বিল শুকিয়ে ফেলায় ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এতে আমাদের জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়বে।

এদিকে এলাকাবাসী ও কিছু ইজারাদার বিল খনন ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর পলিমাটি পড়তে পড়তে বিল এখন ভরাট হয়ে গেছে। এতে বিলে পানির ধারণক্ষমতাও কমে গেছে। পরিকল্পিতভাবে খনন ও সংস্কার করা হলে বিলগুলোতে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত হবে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় বলেন, ইজারা আইনে বিল সম্পূর্ণ শুকিয়ে মাছ আহরণের কোনো সুযোগ নেই। ইজারাদাররা কেবল পানি কিছুটা কমিয়ে মাছ ধরতে পারেন। যদি কোথাও আইন অমান্য করে বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হয়, তাহলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মধ্যনগর উপজেলা বি.পি. স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক গোলাম জিলানী বলেন, সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ধান ও মিঠা পানির মাছ। বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই বোরো ক্ষেত তলিয়ে যায়। আর শুকনো মৌসুমে কিছু অসাধু ইজারাদার প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে প্রতিবছর বিল সেচে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করে চলছে। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মিঠা পানির মাছ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, মৎস্য আইনে কোথাও বিল শুকিয়ে মাছ ধরার অনুমতি নেই। মৎস্য ও ইজারাদারদের জন্য এটি সম্পূর্ণভাবে আইনের পরিপন্থী। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং কোথাও বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হলে আমাদের অবহিত করতে হবে।