নির্দিষ্ট কোম্পানির গাইড বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করে কমিশন হিসেবে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক। এ বিষয়ে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় গত ৯ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরই প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা সচিবের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গতকাল সোমবার স্কুলের প্রধান শিক্ষককে শোকজ করেছে। গত ৫ এপ্রিল রোববার মাউশির মহাপরিচালকের পক্ষে শিক্ষা কর্মকর্তা মো: নাজিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রধান শিক্ষককে দেয়া কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, স্কুলের জনৈক অভিভাবক একলিমুর রেজার কোরাইসের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা যায়, আপনি (প্রধান শিক্ষক) নিয়ম ভঙ্গ করে এনসিটিবি নির্ধারিত বইয়ের বাইরে অসৎ উদ্দেশ্যে এবং অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে একটি কোম্পানির নোট ও গাইড বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মনিপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বুকলিস্টেও নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির গাইড বই উল্লেখ করে সেগুলো অভিভাবকদের কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্কুলের অনেক অভিভাবকও মৌখিকভাবে বিষয়টি সভাপতি ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
এদিকে মাউশি থেকে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিয়ম ভঙ্গ করে এনসিটিবি আইন ২০১৮ এর ১৬(১) এবং এমপিও নীতিমালা ২০২৫ এর ১৮.১ (খ) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন বিধায় বর্ণিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির পদ শূণ্য ঘোষণা করা এবং প্রধান শিক্ষকের (ভারপ্রাপ্ত) বিরুদ্ধে এমপিও নীতিমালা ২০২৫ এর ১৮.১ (খ) ধারা মোতাবেক কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় মাউশি বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা দেশেই আড়ালে আবডালে গাইড বই ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখন সক্রিয় হয়েছে। এ বছরও শুরু থেকেই রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী মনিপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের নোটিশেও পাঞ্জেরী এবং অক্ষরপত্র প্রকাশনীর গাইড ও মূল বই কিনতে অভিভাবকদের নোটিশ দেয়া হয়। অবশ্য সচেতন অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি সরকারের নজরে আনার তৎপরতাও চোখে পড়েছে। অভিভাবকদের একটি গ্রুপ গত ৪ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। সেখানে রেজা কোরাইস নামে একজন অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে উদ্দেশ্য করে লেখা আবেদনে বলেছেন, এনসিটিবি অনুমোদিত বইয়ের বাইরে বিভিন্ন প্রকাশনীর অননুমোদিত বই পাঠ্য করা ও ক্রয়ে বাধ্য করার বিষয়ে আমরা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে আপনার জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছি। রাজধানীর নির্দিষ্ট একটি স্কুলের নাম উল্লেখ করে এই অভিভাবক লিখেছেন, রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ ছিল মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও অধ্যক্ষ বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছ থেকে কমিশন নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য অননুমোদিত বই পাঠ্য করেছেন। এই অননুমোদিত বইয়ের তালিকায় শাখা প্রধানরা স্বাক্ষর করেছেন এবং শ্রেণী শিক্ষকরা বইয়ের তালিকা অভিভাবকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠিয়েছেন এবং কিনতে বলেছেন। এভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর অননুমোদিত বই চাপানো হয়েছে যা মেধা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নয়, শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা আদায়ের জন্য। যেখানে সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে, সেখানে অতিরিক্ত বই ছাপানো স্পষ্টভাবে আইন ও শিক্ষানীতি লঙ্ঘন। অভিভাবকদের মধ্যে আমরা অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, প্রতি বছর এভাবে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর বই ছাপিয়ে দিয়ে কমিশন বাবদ অর্ধকোটি টাকা নিয়েছে স্কুলের বর্তমান কমিটি।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের একাধিক সূত্র নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানায়, প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো: সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত গত ২১ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত নোটিশ ও বইয়ের তালিকা ২০২৬ অনুযায়ী বইয়ের যে তালিকা দেয়া হয়েছে, সেখানে প্রতিটি শ্রেণীর পৃথকভাবে বইয়ের তালিকায় নির্দিষ্ট করে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর বইয়ের নাম উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। আবার সহায়ক বইয়ের তালিকায় অর্থাৎ গাইড বইয়ের তালিকায়ও নির্দিষ্ট করে পাঞ্জেরী প্রকাশনীর গাইড বই শিক্ষার্থীদের কিনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষরিত বুকলিস্ট এবং সহায়ক বইয়ের তালিকা মন্ত্রণালয় ও নয়া দিগন্ত কার্যলয়েও অভিভাবকরা পাঠিয়েছেন।



