শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার শুরু

Printed Edition
শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা  মামলার বিচার শুরু
শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • ডলার নামে এক ব্যক্তির ওপর দায় চাপিয়ে বক্তব্য সোহেলের
  • ডিএনএ রিপোর্ট আসামিদের বিরুদ্ধে নয়, দাবি আসামিপক্ষের

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হলো। গতকাল সোমবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গঠন করেন। একই সাথে মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় দিন ধার্য করা হয়েছে।

তবে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ার এই দিনেই মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ‘ডলার’ নামের মিরপুরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ তুলে নতুন আলোচনার জন্ম দেন। আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার পথে এবং কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রানা সাংবাদিক ও উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে দাবি করে, সে নিজে রামিসাকে ধর্ষণ বা হত্যা করেনি, বরং ডলার নামের ওই ব্যক্তিই এর জন্য দায়ী। যদিও পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা এটিকে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপকৌশল হিসেবেই দেখছেন। আদালত সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুনানি শেষে আসামিদের ঘটনার বিষয়ে দোষী না নির্দোষ জানতে চাইলে তারা নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেন। এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) পড়ে শোনানোর সময় আসামি সোহেল রানা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, ‘আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নাই’। এ সময় স্ত্রী স্বপ্নাও সোহেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বলো, বলো আমার কোনো দোষ ছিল?’ কিন্তু আদালত তাদের এসব অসংলগ্ন কথা আমলে না নিয়ে চার্জ পড়ে শোনান।

এরপর আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার পথে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে জোরে জোরে বলতে থাকে, ‘মিরপুর-১১ নম্বর লাইনে বাড়ি ডলারের। রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার মূল আসামি ওই ডলার। ধর্ষণও ডলার করছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন আপনারা, সব পাবেন।’ সে আরো দাবি করে, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে ‘দুই লাখ টাকা’ দেয়ার কথা বলেছিল এবং সে অলরেডি সেই টাকা পেয়েছে। সোহেল নিজেকে আংশিক নির্দোষ দাবি করে বলে, ‘আমার ওয়াইফ আমাকে সাহায্য করেনি। আমার ওয়াইফের কোনো দোষ নাই। দোষ ডলারের আছে। আমি অত অপরাধী না। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরো করছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছেও ডলার। আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট নেয়নি। অটোমেটিক নিয়ে নিছে।’ একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলে দেন।

পুলিশ ও আইনজীবীদের বক্তব্য

সোহেল রানার এই আকস্মিক দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সোহেল যে কতটা ভয়ঙ্কর তা এলাকার সবাই জানে। তার স্ত্রীও আগে পুলিশকে জানিয়েছেন যে তার স্বামী অত্যন্ত বিকৃতমনার। মামলার বিচারকাজকে ব্যাহত করতে এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে সে এখন নতুন করে এই ডলার নাটক তৈরি করছে। ঘাতক সোহেল ও তার স্ত্রী দুজনই ইতিপূর্বে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এ দিকে আসামিপক্ষে সরকার নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসামিরা আমার কাছে ডলার সম্পর্কে কিছুই বলেনি। তারা কেবল বলেছে যে তারা নির্দোষ।’ পুলিশ রিপোর্টে বা চার্জশিটেও ডলার নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই বলে তিনি নিশ্চিত করেন। আলোচিত এই মামলায় আসামিপক্ষে কোনো নিজস্ব আইনজীবী না থাকায় রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে ঢাকা বারের সদস্য মুসা কালিমুল্যাহকে নিয়োগ দেয় আইন মন্ত্রণালয়। শুনানিতে তিনি আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করে দাবি করেন, এই মামলায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী নেই এবং ডিএনএ রিপোর্টও আসামিদের বিরুদ্ধে নয়।

অপর দিকে, রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনার জন্য আইন মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুকে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীও অভিযোগ গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু শুনানিতে বলেন, অভিযোগপত্র অনুযায়ী আসামি সোহেল রানা নৃশংসভাবে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন এবং প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে দেহ কয়েক খণ্ড করেছেন, যেখানে তার স্ত্রী তাকে সহযোগিতা করেছেন। তিনি সোহেল রানার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় এবং স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে ৯(১) ও ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠনের আবেদন জানান। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ওই ধারাগুলোতে অভিযোগ গঠন করেন। শুনানি শেষে পিপি দুলু সাংবাদিকদের জানান, মামলাটি যেন দ্রুততম সময়ে শেষ হয়, রাষ্ট্রপক্ষ সেই দায়িত্ব পালন করবে।

গতকাল অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ভোর পৌনে ৮টার দিকেই আসামিদের প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হয়। সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে আনা হয়। বেলা ১১টার কিছু আগে সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে এবং ১১টা ৬ মিনিটে স্বপ্নাকে নারী হাজতখানা থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে হাজির করা হয়।

এর আগে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দিয়েছিলেন। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, মামলার মূল চার্জশিটে ১৫ জনকে সাক্ষী করা হলেও পরবর্তীতে তা সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ফরেনসিক শাখা থেকে ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই দ্রুততম সময়ে এই চার্জশিট প্রস্তুত করেন, যা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খানও নিশ্চিত করেছিলেন। এ দিকে মামলার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ও চার্জশিটের বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর দিন নিহতের বাবা বাদি হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই দিন বিকেলেই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে হাজির করা হলে ঘাতক সোহেল রানা নিজে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়। জবানবন্দিতে সোহেল জানায়, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা নিজেদের ঘর থেকে বের হলে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ফুসলিয়ে তাকে তাদের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে মাদকাসক্ত ও বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত সোহেল রানা। ধর্ষণের তীব্রতায় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, ঠিক সেই মুহূর্তে রামিসার মা নিখোঁজ মেয়ের সন্ধানে সোহেলদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে সোহেল রানা বাথরুমের ভেতরেই ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার গলা কেটে হত্যা করে।

এরপর লাশ গুম ও প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সে রামিসার মাথা কেটে ধড় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর খণ্ডিত লাশটি বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং ছুরি দিয়ে তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। জবানবন্দী অনুযায়ী, এই পুরো নৃশংসতার সময় তার স্ত্রী স্বপ্না একই রুমে অবস্থান করে তাকে সহযোগিতা করছিলেন। পরবর্তীতে জানালার গ্রিল কেটে ঘাতক সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও ওই বাসা থেকেই তার স্ত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটকে সমর্থ হয় পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কোনো পূর্বশত্রুতা না থাকলেও কেবল বিকৃত মানসিকতা থেকেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।