সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের শপথ : আইনজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক

Printed Edition

আলমগীর কবির

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির সদস্যরা। তবে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির বিজয়ীরা উভয় শপথই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিমুখী অবস্থানের পর ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ এর বৈধতা ও শপথের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞদের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবার প্রথমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপির সদস্যরা শপথ নেন এবং এরপর ক্রমানুসারে জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা শপথ নেন। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার বিষয়ে শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। হাতে একটি ফর্ম দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে। কোনো এ রকম ফর্ম-এটা সংবিধানে নেই।’ সালাহউদ্দিন আহমদ আরও যোগ করেন, ‘এই ফর্মটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফর্ম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এ পর্যন্ত আমরা এসেছি।’ তিনি জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং বিএনপি সংবিধান মেনেই রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

বিএনপির এ অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়েছে এবং তাতে সংস্কার পরিষদের শপথ যুক্ত করা হয়েছে, তা ‘বেআইনি’। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সংবিধানকে আপনি আলাদা আরেকটা আদেশ দিয়ে কি সাবস্টিটিউট করতে পারবেন?’

এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ খান নয়া দিগন্তকে অত্যন্ত বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী মতামত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি যে শপথ নিতে চাচ্ছে না, তা কিন্তু তারা বলেনি। বিএনপির মুখপাত্র সালাউদ্দিন আহমদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরিফ খান ব্যাখ্যা করেন, ‘সকল অধ্যাদেশ বা আদেশ যা অন্তর্বর্তী সময়ে পাস হয়েছে, সেগুলো প্রত্যেকটা আগে সংসদে উত্থাপন করতে হবে। উত্থাপন করলে তবেই তা আইনে পরিণত হবে। সংসদ গঠন করার পর ওইগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদে পাস না হবে, ততক্ষণ কিন্তু এগুলো আইন না। ওই আইনে পরিণত হওয়ার ফরমালিটি শেষ হওয়ার পরই তারা তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।’

তিনি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উল্লেখ করে বলেন, ‘ওনারা তো জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার জন্য ভোটে দাঁড়িয়েছেন। আসলে তো তারা কনস্টিটিউট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে ভোট করেন নাই। অতএব এটার জন্য আলাদা শপথ নেয়ার দরকার আছে কি না, তা বিবেচ্য। এই যে শপথটা জুলাই জাতীয় সনদ অধ্যাদেশে ঢোকানো হয়েছে, এই শপথের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তারা একটি প্রশ্ন তুলেছেন। এটা নিয়ে স্ক্রুটিনি হতে পারে।’ তিনি মনে করেন, এতে জুলাই সনদ প্রশ্নবিদ্ধ বা বাতিল হয়ে যায় না, বরং এটি আইনিভাবে কতটা প্রয়োজনীয় সেই প্রশ্নই বিএনপি তুলেছে। জামায়াত এই প্রশ্ন না তুলে শপথ নিলেও এর কোনোটিই জুলাই সনদকে এখনই অস্বীকার করা বোঝায় না।

আরিফ খান আরও বলেন, আইনজীবীরা কোনো দলিলকে গ্রামার বা আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করেন, যা সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির সাথে খাপ খায় না। সমাজ, রাষ্ট্র ও স্থিতিশীলতা বিবেচনা করে এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জুলাই সনদে বিএনপি শপথ নেবে না, এমন কথা তারা বলেনি। তারা গত মঙ্গলবার নেয়নি কারণ তাদের পয়েন্ট হলো মঙ্গলবার ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটে নির্বাচিত এমপিদের শপথ। সেই শপথ তারা নিয়েছে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে যে গণপরিষদ গঠিত হয়ে ১৮০ দিন এ সংসদেই কাজ করবে, সেটার ভিত্তিতে তো কোনো নির্বাচন হয়নি, ওটা ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট হয়েছে শুধু সনদের গ্রহণযোগ্যতার ওপরে। ফলে বিএনপির এই পয়েন্টটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছায়ায় গত আঠার মাসের শাসনকাল সম্পর্কে তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন গত দুই বছর সংবিধানের বাইরে কাজ হয়েছে, কিন্তু সেটি ভুল ধারণা। তিনি দাবি করেন, ‘আমরা গত দুই বছর ১০০ ভাগ সংবিধান মেনে কাজ করেছি। ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনটি ছিল অপরিহার্য। ইউনূস সাহেবের সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি ছায়া আছে। ২০০৮ সালের ‘সুলতানা কামাল বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে তারা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে এ পুরো প্রক্রিয়াটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই চলেছে।’

বিপরীতে, অ্যাডভোকেট শিশির মনির এ শপথ না নেয়াকে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আদেশের ধারা-৮ এর উপধারা ২-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সংসদ সদস্যদের যিনি শপথ পড়াবেন, সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরও তিনিই শপথ পড়াবেন। এখানে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানে নেই-এমন অজুহাত অগ্রহণযোগ্য।’ তিনি বিএনপির এ সিদ্ধান্তকে প্রচলিত আইন ভঙ্গ করা, বিশেষ আদেশ অমান্য করা, জনমতের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং জুলাই সনদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ অবশ্য বিএনপির অবস্থানকেই সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, সংবিধানে না থাকলে কেন তারা শপথ নেবেন? সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়াই যথেষ্ট। জুলাই সনদকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি তাদের নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির ভিত্তিতে কাজ করবে এবং এর জন্য পৃথক শপথের প্রয়োজন নেই।

আইনজীবীদের এ নানামুখী বিতর্ক এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থানের কারণে নবগঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ ও জুলাই সনদের আইনি প্রয়োগ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হলো।