নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- গাজা পুনর্গঠনে ফিলিস্তিনিদের অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জার্মানির
- ইসরাইলি অবরোধে মৃত্যুমুখে হাজারো ফিলিস্তিনি ক্যানসার রোগী
গাজার ভবিষ্যৎ ও চলমান যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার শনিবার ইসরাইলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দু’টি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাজা পরিস্থিতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা।
এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ‘নিউ গাজা’ নামে একটি নতুন পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এতে সম্পূর্ণ নতুন করে গাজা পুনর্নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে আবাসিক টাওয়ার, ডেটা সেন্টার ও সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটন কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পরিকল্পনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের অংশ, যার লক্ষ্য অক্টোবর মাসে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও একাধিকবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার উত্তর গাজায় ইসরাইলি গুলিতে দুই শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৬৫৪ জনে, যার মধ্যে অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর মারা গেছেন ৪৮১ জন।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অন্তর্বর্তী ফিলিস্তিনি কমিটির প্রধান আলী শায়াত জানিয়েছেন, গাজার প্রধান প্রবেশদ্বার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং আগামী সপ্তাহে খুলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ইসরাইল সীমান্ত দিয়ে গাজায় প্রবেশের সংখ্যা সীমিত রাখতে চায় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। গাজার দিকের এই সীমান্ত ২০২৪ সাল থেকে ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পুনর্গঠনে ফিলিস্তিনিদের অন্তর্ভুক্তি : গাজা পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ফিলিস্তিনি জনগণের মতামত ও অধিকার উপেক্ষা করা যাবে না। বার্লিনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জোসেফ হিন্টারসেহার বলেন, ‘ডাভোসে উপস্থাপিত পরিকল্পনাগুলো আমরা লক্ষ্য করেছি। গাজার ফিলিস্তিনি জনগণকে সব পরিকল্পনার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক ও অস্থিতিশীল। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে পুনর্গঠন নিয়ে কার্যকর আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয়।
হিন্টারসেহার আরো বলেন, গাজা পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রক্রিয়া, যা ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠন সম্মেলনের ঘোষণা ইতিবাচক সঙ্কেত হলেও বাস্তব প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন হয়নি। তার মতে ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ ছাড়া গাজার পুনর্গঠন কোনোভাবেই টেকসই ও ন্যায্য হবে না।
চিকিৎসাহীনতায় বাড়ছে মৃত্যু : যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধে গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ক্যানসার রোগী এখন চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, জরুরি চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা সরিয়ে নেয়া (মেডিকেল ইভাকুয়েশন) প্রয়োজন এমন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা হাজারের বেশি হলেও তাদের বেশির ভাগই গাজা ছাড়তে পারছেন না।
গাজা যুদ্ধ শুরুর সময় মাত্র ১৮ মাস বয়সী ইসমাইল আবু নাজি এক বিরল রক্ত ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। যুদ্ধের আগে তাকে জেরুসালেমের আল-মাকাসেদ হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরাইলি অবরোধের কারণে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এখন তিনি গাজার হাজারো ক্যানসার রোগীর একজন, যারা যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন।
চিকিৎসকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় ক্যানসারজনিত মৃত্যুর হার তিন গুণ বেড়েছে। ইসরাইলের হামলায় হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ায় এবং কেমোথেরাপির ওষুধ প্রবেশে বাধা থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের মার্চে গাজার একমাত্র বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ার পর অনকোলজি সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের অনকোলজি বিশেষজ্ঞ ডা: সালেহ শেখ আল-ঈদ বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সরঞ্জাম পর্যন্ত নেই। অনেক রোগীকে সঠিকভাবে শনাক্ত বা চিকিৎসা না করেই হারাতে হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেয়া হলেও গাজায় এখনো ১১ হাজারের বেশি ক্যানসার রোগী চিকিৎসার অপেক্ষায়। জাতিসঙ্ঘ জানায়, চিকিৎসা অনুমতির অপেক্ষায় ইতোমধ্যে অন্তত ৯০০ জন মারা গেছেন।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, চিকিৎসা সরিয়ে নেয়ায় বাধা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তীব্র শীতের মধ্যে একটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসমাইলের ক্ষত পরিষ্কার করতে করতে তার মা আয়া আবু হানি বলেন, ‘একজন মা হিসেবে সন্তানের এই কষ্ট দেখা অসহ্য। আমি শুধু চাই, সে যেন ব্যথামুক্তভাবে বাঁচার অধিকার পায়।’
পশ্চিমতীরে ওপর চাপ বাড়ছে : ইসরাইলি কারফিউ, সামরিক অভিযান ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর চাপ আরো তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক দফতর (ওসিএইসএ)। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব পদক্ষেপে চলাচল সীমিত হচ্ছে, মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার ব্যাহত হচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘ জানায়, জানুয়ারির ১৯ তারিখে হেবরনের এইচ-২ এলাকায় বড় ধরনের অভিযানের পর প্রায় ২৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে কারফিউয়ের আওতায় আনা হয়। এতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রবেশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। একই সময়ে দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত ৮৭ জন আহত হন।
গত দুই সপ্তাহে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১০০টির বেশি বেদুইন ও পশুপালক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও স্কুলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসঙ্ঘ সতর্ক করেছে, সহিংসতা, উচ্ছেদ ও অর্থনৈতিক সঙ্কট মিলিয়ে পশ্চিমতীরে মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত মানুষ : গাজায় কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শীত ও বৃষ্টির মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। প্রবল বাতাসে শত শত তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত তাঁবু মেরামতের চেষ্টা চলছে, তবে টেকসই আশ্রয় সমাধান জরুরি। ইউনিসেফ দীর্ঘ দুই বছর পর প্রথমবারের মতো শিশুদের জন্য শিক্ষা উপকরণ পাঠিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ ইসরাইলের প্রতি ত্রাণসামগ্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হামলা : অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে স্থানীয় হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় বোমা হামলায় একাধিক ফিলিস্তিনি আহত হন। বেইত লাহিয়া, খান ইউনিস ও গাজা সিটিতেও গুলিবর্ষণ ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইলি নৌবাহিনী গাজার উপকূলে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য সূত্র জানায়, এসব হামলায় বহু মানুষ আহত হলেও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এই ধরনের হামলা গাজায় উত্তেজনা আরো বাড়াচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



