নায়িকা থেকে ‘আম্মাজান’ ৭৯ বছরের শবনম

Printed Edition
নায়িকা থেকে ‘আম্মাজান’ ৭৯ বছরের শবনম
নায়িকা থেকে ‘আম্মাজান’ ৭৯ বছরের শবনম

সাকিবুল হাসান

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি নাম উচ্চারণ করলেই যেন শ্রদ্ধা, আবেগ ও স্মৃতির দরজা খুলে যায় সে নাম শবনম। একাধারে অভিনেত্রী, একাধারে প্রতিভার প্রতীক। ১৯৬০ সালের একটি দৃশ্য থেকে যাত্রা শুরু করে আজ ৭৯ বছরে পা দিয়েছেন তিনি, আর পেছনে রেখে এসেছেন দীর্ঘ ৬৫ বছরের গৌরবময় চলচ্চিত্র-ভবিষ্যৎ।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ দু’টি ভূখণ্ড, দু’টি সংস্কৃতি, দু’টি চলচ্চিত্রধারার মধ্যবর্তী সেতুবন্ধনের নাম হয়ে উঠেছেন শবনম। তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন; বরং চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।

তার চলচ্চিত্রে পদার্পণ ঘটে ১৯৬০ সালে, রাজধানীর বুকে সিনেমার একটি গানের পারফরম্যান্স দিয়ে ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি।’ গানের ছোট্ট এই দৃশ্যেই শবনম যেভাবে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন, তা ছিল একেবারে যুগান্তকারী। তখনো অনেকে জানতেন না, এই স্বল্প উপস্থিতিই ভবিষ্যতের এক কিংবদন্তির আগমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরের বছর, ১৯৬১ সালে মুস্তাফিজ পরিচালিত হারানো দিন সিনেমায় রহমানের সাথে জুটি বাঁধেন তিনি। এ ছবির মুক্তির দিন ছিল ৪ আগস্ট, যা পরবর্তীতে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রে শবনম-রহমান জুটির জয়যাত্রার সূচনা করে। এরপর একে একে মুক্তি পেতে থাকে ‘জোয়ার-ভাটা’, ‘আমার সংসার’, ‘চান্দা’ ‘তালাশ’, ‘প্রীত না জানে রীত’, ‘দরশন’, ‘চলো মান গায়ে’, ‘চাহাত’সহ অসংখ্য সিনেমা যা আজো সিনেমাপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।

শবনমের সৌভাগ্যের বছর বলা হয় ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়টিকে। ১৯৬২ সালে এহতেশামের চান্দা, ১৯৬৩ সালে মুস্তাফিজের তালাশ এবং মাসউদ চৌধুরীর প্রীত না জানে রীত একের পর এক সাফল্য এনে দেয় তাকে। ১৯৬৪ সালে আসে পয়সা, আর একই বছরে কবরীর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে সুভাষ দত্তের সুতরাং দিয়ে যার বিপরীতে তখন শবনম ছিলেন ইতোমধ্যে এক প্রতিষ্ঠিত নাম।

১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় সাদেক খানের ক্যায়সে কাহু, যেখানে শবনম আবারো নিজেকে প্রমাণ করেন। ১৯৬৬ সালে আখেরি স্টেশনে তিনি ছিলেন মূল চরিত্রে, আর নায়করাজ রাজ্জাক ছিলেন ছোট একটি চরিত্রে যেটি তার চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা ছিল। একই বছরে মুক্তি পায় রহমানের দরশন এবং এহতেশামের চকোরি দিয়ে শাবানার অভিষেক ঘটে।

শুধু বাংলাদেশের সিনেমা নয়, পাকিস্তানেও শবনম ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বিশেষ করে ৭০-৮০ দশকে তিনি হয়ে ওঠেন সে দেশের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন নায়িকা। এই ব্যস্ততার কারণে বাংলাদেশের অনেক সিনেমায় তিনি কাজ করতে পারেননি, তবে যে ক’টি করেছেন, তা আজো স্মরণীয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে, ৮ জানুয়ারি, মুক্তি পায় অশোক ঘোষ পরিচালিত নাচের পুতুল, যেখানে শবনম অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসেন। এই সিনেমারই গান ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ আজো দেশের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র গানের তালিকায় স্থান পায়।

পরবর্তী সময়ে তিনি অভিনয় করেন শর্ত, সন্ধান, জুলি, কারণ, যোগাযোগ, সন্দেহসহ বেশ কিছু ছবিতে। প্রতিটিতেই তার অভিনয়ের মুন্সিয়ানা ছিল প্রশ্নাতীত।

দীর্ঘ বিরতির পর, ১৯৯৯ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত আম্মাজান সিনেমায় ফিরে আসেন তিনি। এই সিনেমায় তিনি নায়ক মান্নার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে এমন এক শক্তিশালী ছাপ রাখেন যে, এরপর থেকে তিনি ‘আম্মাজান’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। দর্শক আজো তাকে সেই নামেই স্মরণ করেন, সেই চরিত্রেই ভালোবাসেন।

অভিনয়ের জন্য বহুবার পেয়েছেন স্বীকৃতি ও সম্মাননা, তবে শবনম কখনোই নিজেকে শুধুই পুরস্কারের কাঠামোতে বন্দী রাখেননি; বরং অভিনয়ের প্রতি তার ভালোবাসা ও নিষ্ঠাই তাকে কালজয়ী করে তুলেছে।

বর্তমানে চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকলেও তিনি রয়ে গেছেন দর্শকের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে। আজ ৭৯তম জন্মদিনেও তার কোনো বিশেষ আয়োজন নেই; বরং সময় কাটছে স্মৃতিচারণে। ছোটবেলার কথা মনে করে বলেন, ‘ছোটবেলায় জন্মদিন মানেই আনন্দ, উপহার, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ। এখন আর সে সব নেই। বাবা-মাকে খুব মিস করি, ফেলে আসা দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। জীবনের শেষ সময়ে এসে একটি চাওয়া- যত দিন বাঁচি, যেন সুস্থ থাকি। আর আমার দেশটা যেন ভালো থাকে, দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে।’

এই কথাগুলো বলার সময় শবনম যেন একসাথে হয়ে উঠেন মা, মাটির মানুষ, আর একজন শিল্পী যার জীবন কেটেছে আলো ও ভালোবাসার মিশেলে।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন চিত্রনায়িকা খুব কমই আছেন, যিনি সময়ের পরিক্রমায় শুধু দর্শকের নয়, ইতিহাসেরও অংশ হয়ে ওঠেন। শবনম ঠিক তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস, এক চলমান প্রতীক, যিনি নিজেই একটি যুগ।