নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তান ট্রাম্প, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সফল কূটনীতিতে নিজেকে সুবিধাজনক স্থানে নিতে পেরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এজন্য ভারতীয় ভুল পদক্ষেপ আংশিক হলেও দায়ী। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরালায় সমর্থকদের একটি বিশাল সমাবেশে মোদি বজ্রমুষ্টি তুলে পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘ভারত আপনাকে বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়েছে এবং আমরা সেই প্রচেষ্টাগুলোকে আরো জোরদার করব। আমরা নিশ্চিত করব যে, আপনি বিশ্বজুড়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। পাকিস্তানের নেতাদের শোনা উচিত : আমাদের ১৮ জন সৈন্যের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।’
এক দশক পরে, বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে পাকিস্তান এখন অনেক দূরে : এটি কেবল চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র হওয়ায় নয়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, সেনাপ্রধান আসীম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলামাবাদ এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বারবার পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক মর্যাদা মোদির প্রশাসনের ভুল পদক্ষেপগুলোকে চিহ্নিত করেছে। আটলান্টিক কাউন্সিল থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘অবশ্যই, আঞ্চলিক এবং বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের প্রভাব কমিয়ে আনা তথা বিচ্ছিন্ন করার ভারতের কৌশলটি ব্যাপকভাবে বিপরীতমুখী হয়েছে।’
ট্রাম্পের নিজেকে নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদের মধ্যে শান্তিপ্রণেতা হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা ভারতের জন্য ইতিবাচক ছিল না। ভারত দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে আসছিল যে তার প্রতিবেশীর সাথে বিরোধগুলো কঠোরভাবে দ্বিপক্ষীয় ছিল, যা দুু’টি দেশ নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে পারে- যদিও মার্কিন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের অবসানে ভূমিকা রেখেছিলেন।
গত বছরের জুন মাসে, মোদি যখন কানাডা সফর করছিলেন তখন ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটনে উড়ে যেতে বলেছিলেন। সেই প্রস্তাব তখন ফিরিয়ে দেন মোদি। পরিবর্তে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ফোনে বলেছিলেন যে, নয়াদিল্লি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণ করবে না এবং মে মাসে যুদ্ধবিরতি শুধুমাত্র পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় কথোপকথনের ফলাফল।
ট্রাম্প তখন থেকে ৩০টিরও বেশি অনুষ্ঠানে জোর দিয়েছিলেন যে, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো জোর দিয়েছিলেন যে, সংঘর্ষের প্রথম দিনেই ভারতীয় যুদ্ধবিমানগুলোকে গুলি করে নামানো হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়াদিল্লিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেই হামলায় পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।
‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না’
কয়েক দশক ধরে, ভারত সরকার পাকিস্তানের সাথে ‘কৌশলগত সংযমের’ মতবাদ অনুসরণ করছে। গত বছরের সামরিক সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে, সেই সমীকরণগুলো বদলাতে শুরু করে। ওয়াশিংটন এবং নয়াদিল্লির মধ্যে ২০ বছরেরও বেশি কৌশলগত সম্পর্ক ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের কারণে চাপে পড়েছিল। ভারতকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শুল্ক চাপানো হয়েছিল। বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে অবশ্য শুল্ক কমে এলেও উত্তেজনা রয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য নিয়ে ভারতকে চাপ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমন সময়ে যখন নয়াদিল্লির বৈদেশিক রিজার্ভ কমে গেছে।
বিপত্তি এবং পরিবর্তন
নয়াদিল্লির বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে বিস্তৃত পরিবর্তনগুলো প্রতিবেশীর তুলনায় তার মর্যাদাকে দুর্বল করেছে। ভারতীয় নেতা তার পররাষ্ট্রনীতি ‘প্রথমে প্রতিবেশী’ ধারণা দিলেও মোদির সরকার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) একটি শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে যখন ইসলামাবাদ ছিল এর আয়োজক। পরিবর্তে, ভারত বিমসটেককে উন্নীত করার চেষ্টা করেছে, যা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশীয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর একটি গ্রুপ। এই গ্রুপটি এখনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
এ দিকে, ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভারতের সাথে গত বছরের সংঘাতের সময় আরো ঘনিষ্ঠ হয়। পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও জেট বিমান ব্যবহার করেছে। মোদির ভারত শুধু সার্ককে পরিত্যাগ করেনি : কিছু বিশ্লেষক বলেছেন যে, নয়াদিল্লি তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি থেকেও সরে গেছে অর্থাৎ কোনো দেশের কক্ষপথে না গিয়ে সমস্ত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সাথে কাজ করা।
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর, মোদি সরকার ইরানের তেল কেনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। দ্য হিন্দু পত্রিকার কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞাগুলি শুধুমাত্র ভারতের অর্থনীতির ক্ষতি করে না, তারা ভারতের পররাষ্ট্র নীতিকে অন্যের ইচ্ছার দিকে বাঁকানোর চেষ্টা করে এবং এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের গর্বিত নীতির জন্য একটি আঘাত।’
ইসরাইল এবং ইসলামফোবিয়া
ভারত ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যদিও এটি বেশ কয়েক বছর আগে গোপনীয় সহযোগিতা, বিশেষ করে নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষায়, অনুসরণ করেছিল। মোদির অধীনে, ভারত ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে এবং এর বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা। নয়াদিল্লি ক্রমাগতভাবে ইসরাইলের সমালোচনামূলক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবগুলো থেকে বিরত থেকেছে। ভারত একবারের জন্যও গাজায় গণহত্যার নিন্দা করেনি।
২০২২ সালের মে মাসে, বিজেপির তৎকালীন মুখপাত্র নুপুর শর্মা মহানবী মুহাম্মদ সা:-এর বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, যা উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ক্ষোভের কারণ হয়েছিল। সবখানে ভারতীয় দূতদের তলব করা হয়েছিল এবং জনসাধারণের নিন্দা জারি করা হয়েছিল। গোটা মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভ শান্ত করতে বিজেপি এই ঘটনার পর শর্মাকে সরিয়ে দেয়।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে, মুসলমানদের গণপিটুনি, মসজিদ ধ্বংস, রাষ্ট্র-নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা, এবং মুসলিম উপাসক ও উৎসবগুলোর ওপর কড়াকড়ি শিরোনামে প্রাধান্য পেয়েছে। ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন নিয়ে অধিকার গোষ্ঠী এবং নজরদারিকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। (সংক্ষেপিত)



