ছোট্ট একটি দেশ-যার আয়তন মাত্র এক লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ বর্গ কিলোমিটার। পৃথিবীর মানচিত্রে তেমন দৃষ্টি গোচর হয় না- মনে হয় একটি বড় ধরনের বিন্দু মাত্র। কিন্তু ছোট্ট এই দেশটির সমগ্র অবয়বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে-অনেক রূপকথা কিংবদন্তি এবং সাড়াজাগানো বাস্তব সত্য গল্প-কাহিনী। অপরিসীম সাহসিকতা ও চমকপ্রদ বীরত্বের মহৎবীরত্ব গাঁথা । দেশটি সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা-রূপসী বাংলা বটে। সোনার বাংলা নামেও সমধিক পরিচিত। নদী মাতৃক এ দেশটির রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য। বহু ধরনের কিংবদন্তির এক মহা ভাণ্ডার এ বাংলাদেশ। এ দেশের সমৃদ্ধ ধনভাণ্ডার দেখে চমক লাগা অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি দেখে-জন মানুষের আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে অনেক বিদেশীই আর তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেননি । এদেশের রমণীকুলের পাণি গ্রহণ করে- এ দেশের মায়াবী কৃষ্টি কালচার অবলোকন করে পলি মাটির মায়ায় এ দেশেই শেষ শয্যা গ্রহণ করেছেন। আবার কেউ কেউ শুধু লুণ্ঠনের উদ্দেশে লুটতরাজের লক্ষ্যে দস্যুগিরি করে এ দেশকে পদদলিত করে বিশাল ক্ষতি করতে চেয়েছে। লুণ্ঠই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য- এরা জাতি হিসেবে সা¤্রাজ্যবাদী লুটেরা। লুটপাট করে সুপার পাওয়ার সেজেছে। এখনো সে ধারা অব্যাহত গতিতে চলছেই।
কিন্তু মহান সৃষ্টি কর্তার অপার দয়া ও সুদৃষ্টির কারণে বাংলাদেশ নামক ছোট এ দেশটিকে ধন ও মেধাশূন্য করতে ওরা সক্ষম হয়নি; বরং ব্রিটিশ বেনিয়াদের দীর্ঘ পৌনে দু শ’ বছরের অপরিসীম শোষণ এবং পাক দুর্বৃত্তদের ২৫ বছরের অপশাসনের পরও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস অব্যাহত গতিতে চলছে। আয়তনে ছোট অথচ জন সংখ্যাধিক্যোর কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে না; বরং উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিকে ধীরে এগোচ্ছে। মেধা ও ধীশক্তিতে বাংলাদেশর নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে নেই মোটেই। নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনষ্ক এবং আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে পারলেই বিশ্বে বিশাল অবদান রাখতে সক্ষম হবে। দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করতে সমর্থ হবে। দুর্নীতির অবাধ আগ্রাসন এবং লুটেরা ও চরিত্রহীন নেতৃত্বের থাবায় বাংলাদেশ প্রায় বিধ্বস্ত হওয়ার-বাজে এবং কুৎসিত কুসন্তানদের দেশের বিপুল অঙ্কের অর্থ ও সম্পদ পাচারের পরও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে সংকল্পবদ্ধ। এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য অবশ্যই সৌভাগ্যের ইঙ্গিত বহন করছে। কতিপয় দুর্বৃত্ত কর্তৃক এদেশে বিদেশীদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের অপপ্রয়াস এখনো অব্যাহত তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার নিজ পায়ে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর। এদেশ যদি একটি সুষ্ঠু ও পক্ষপাতিত্বহীন নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হয়। তবে দেশবিরোধী শত্রুরা হালে আর পানি পাবে না, ওরা বিদেশে পচে চিরতরে হারিয়ে যেতে সময় বেশি নেবে না। বিদেশে বসে যারা কলকাঠি নাড়ছে ওদের ধ্বংস ও বিনাশ শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আমরা কারো ক্ষতির চিন্তা করি না, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের ছোট্ট এ দেশটির যেদিকেই হাত দেয়া হয়, সেখানেই তিনি খনিজ সম্পদের বিপুল সমাহার মজুদ রেখেছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খনিজ সম্পদের আবিষ্কার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তেল, লোহা, গ্যাস, চুনাপাথর, রঙিন পাথর, কয়লা, ইউরেনিয়াম ও স্বর্ণসহ বহু মূল্যের খনিজ সম্পদে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ। তা ক্রমেই প্রকাশিত ও দৃশ্যমান হচ্ছে।
অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে এবং মেঘনার অববাহিকায় আরেক বিশাল বাংলাদেশ জেগে ওঠছে। সেখানেও বহু ধরনের খনিজ দ্রব্যের সমাহার লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থাৎ- মূল্যবান বালি ও পেট্রোলিয়ামের সন্ধান ক্রমেই পাওয়া যাচ্ছে। এসব খনিজ দ্রব্যের আবিষ্কার এবং ব্যবহার উপযোগী করতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই একটি ধনী দেশে রূপান্তরিত হতে বেশি সময় নেবে না। সুতরাং অতি দ্রুত বাংলাদেশ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে ইনশাআল্লøাহ।
এই অভিযাত্রাকে থামিয়ে দিতে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের শত্রুর অভাব নেই। অতএব সাধু সাবধান! কে কি করল, সেদিকে তাকানোর সময় ও সুযোগ বাংলাদেশের নেই। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার সময়। পেছনে তাকানোর প্রয়োজন নেই। দেশ ও জাতি গড়ার মহান যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার এখনই সময়। সময় ও সুযোগের অপচয় আর নয়।
বিশ্বের সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বিশেষ করে প্রতিবেশীদেশগুলোর সাথে সমমর্যদার ভিত্তিতে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর ত্বরিত সমাধান করার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কারো সাথেই বৈরিতা নয়; বরং বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখার দিকে তাগিদ দেয়া অতীব আবশ্যক।
তবে বিশ^ মুসলিমের বিভিন্ন সমস্যাও সঙ্কটের সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রামরত মুসলিম ভাইবোনদের প্রতি জোরালো সমর্থন, সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে সমূলে উৎখাতের জন্য বিশ্ব মুসলিমের প্রচেষ্টার প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন জ্ঞাপন অব্যাহত রাখতে হবে।
বিশ্বের যেসব অঞ্চল ও দেশে মুসলিমরা নির্যাতিত হচ্ছে এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত, তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করতে হবে।
সর্বোপরি বাংলাদেশকে একটি আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার কর্মযজ্ঞে দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক দক্ষ জনশক্তিকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। দেশের সবটুকু ভূমির সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ক্রমবর্ধমান খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ উত্তোলন এবং বাজারজাতকরণের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবেই বাংলাদেশ হবে আধুনিক সিঙ্গাপুর, উন্নত দক্ষিণ কুরিয়া, মালয়েশিয়া। সর্বোপরি বাংলাদেশ একটি মানবিক বাংলাদেশে পরিণত করার সর্বাত্মক সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার প্রত্যেকটি মানুষকে গ্রহণ করতে হবে। ৫৪ বছর একেবারে কম সময় কাল নয়; বরং এর চেয়ে আরো কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের বেশ কটি দেশ জাতি বহু ক্ষেত্রেই অগ্রগতি লাভ করেছে। বিশ^কে চমকে দেয়ার মতো বিস্ময়কর উন্নতি ও অগ্রগতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বললে অতুক্তি হওয়ার কথা নয়। অথচ আমাদের বাংলাদেশ দেশ ও জাতিকে কি উপহার দিয়েছে বিগত ৫৪ বছরে। মোটা দাগে যেটি দিয়েছে সেটিই হলো পরনির্ভরশীলতার অক্টোপাস থেকে মুক্তি না পাওয়ার মর্মন্তুদ সীমাহীন বেদনা। কোনো দিক দিয়েই উন্নতির চিহ্ন চোখে পড়ার মতো নয়। পক্ষান্তরে তলাবিহীন ঝুড়ির যে ‘তকমা’ একসময় মিস্টার কিসিঞ্জার দিয়ে বিশ^ব্যাপী খ্যাত হয়েছিলেন। সে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের কপাল লিখন মুছে ফেলার প্রয়াস আজো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই দুঃখ আমরা রাখব কোথায়?
যে বা যারাই ক্ষমতার মসনদ দখল করেছে, তারা তাদের আখের গুছিয়ে কেউ মরে গেছে, আবার কেউ পালিয়ে গেছে অন্য দেশে। এই তো আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের কার্যকলাপ। অথচ এ দেশেটির জন্য কেউ কোনো মহৎ কিছু করেছে বলে কোনো মহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে ইতোপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা জগাখিচুড়ি ধরনের ব্রিটিশ বেনিয়াদের সেক্যুলার শিক্ষার ঘানি আজো টানা হচ্ছে- নিজস্ব জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষা সংস্কৃতির সংস্কার করা হয়নি। একটি সর্বজনীন জাতীয় আদর্শই তো নির্ধারণ সম্ভব হয়নি আজও। তার ওপর আবার আদর্শ নির্ধারণ কে করবে? কারা করবে? যারা ধর্মহীন শিক্ষার নাট-বোল্ট, স্ক্র-ড্রাইভার তারা? গাবগাছ লাগিয়ে আম পাওয়ার আশা এ যে শুধুই দুরাশা।



