নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- আজ বা আগামীকাল হরমুজ খুলে দিতে পারে ইরান
- চুক্তি হলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন ট্রাম্প
- পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা
- কাল ইসলামাবাদে আলোচনায় বসছে ওয়াশিংটন-তেহরান
- লেবাননের ১০০টিরও বেশি স্থানে হামলা ইসরাইলের
ইরানে পরিকল্পিত ভয়াবহ বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরান যদি তার দাবি না মানে তবে ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’- এমন চরম হুমকির পর অবশেষে পিছু হটলেন তিনি। এর বিনিময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দিতে সম্মত হয়েছে ইরান। এই সমঝোতার পেছনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে বড় কৃতিত্ব দিয়েছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সায় দিয়েছে ইরানও। দেশটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এক বিবৃতিতে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সরাসরি অনুমোদনেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল। ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু এবং বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, যা অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ট্রাম্প দাবি করেন যে, আমেরিকা ইতোমধ্যে তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির ভিত্তি হিসেবে একটি ১০ দফার প্রস্তাব পেয়েছেন।
এ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে বিশ্বনেতারা স্বাগত জানিয়েছেন। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমঝোতাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনার মাধ্যমে এই সঙ্ঘাতের একটি স্থায়ী সমাধানের পথ উন্মোচিত হবে বলে বিশ্ববাসী আশাবাদী।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ট্রাম্পের শর্ত : ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অনুরোধের ভিত্তিতে আমি ইরানে আজ রাতের (মঙ্গলবার মধ্যরাত) আক্রমণ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে শর্ত হলো- ইরানকে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক এবং নিরাপদভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।’
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের দেয়া ডেডলাইন বা সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে এই ঘোষণাটি আসে। আগামী দুই সপ্তাহ ইসলামাবাদে এই বিষয়ে পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তি হলে উঠবে নিষেধাজ্ঞা : ট্রাম্প
আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় আলোচনার আগে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নিজের প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানকে আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেয়া হবে না। তবে চুক্তি হলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, সেখানে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) ঘটেছে!’
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বি-২ বোম্বারের হামলার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আর কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে মিলে মাটির গভীরে চাপা পড়া সব পারমাণবিক বর্জ্য বা উপাদান খনন করে সরিয়ে ফেলবে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো দাবি করেছেন, গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট নজরদারির মাধ্যমে দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প আরো বলেছেন, ইরানকে ‘শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা’ থেকে মুক্তি দেয়া হবে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫টি পয়েন্টের মধ্যে ‘অনেকগুলোতেই ইতোমধ্যে ঐকমত্য হয়েছে।’ তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি ইরান।
ইরানের প্রতিক্রিয়া : ট্রাম্পের এই বার্তার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি একটি সম্ভাব্য চুক্তির কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, যদি আমেরিকার পক্ষ থেকে হামলা বন্ধ করা হয়, তবে ইরানের সশস্ত্রবাহিনীও তাদের রক্ষণাত্মক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে। আরাকচি বলেন, ‘আগামী দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।’ তিনি শেষ মুহূর্তে এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত এড়াতে পাকিস্তানের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান।
তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা আলোচনায় বসছে ওয়াশিংটনের প্রতি ‘চরম অবিশ্বাস’ নিয়ে। শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, ‘আমাদের হাতের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে। শত্রুর সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতির মোক্ষম জবাব দেয়া হবে পূর্ণ শক্তি দিয়ে।
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের প্রতি পূর্ণ অবিশ্বাস রেখেই ইসলামাবাদে এ আলোচনা শুরু হবে। ইরান এ আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহ সময় বরাদ্দ করেছে, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরে বাড়ানো যেতে পারে।
ইরানি জনগণের উদ্দেশে বিবৃতিতে বলা হয়, এই সময়ে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং ‘বিজয় উদ্থযাপন’ অব্যাহত রাখা জরুরি। পরিষদ উল্লেখ করেছে যে এ আলোচনা মূলত যুদ্ধক্ষেত্রেরই একটি ধারাবাহিকতা এবং এটি সরাসরি ‘বিপ্লবী নেতৃত্ব’ ও ‘ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘যদি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর আত্মসমর্পণ আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক অর্জনে রূপ নেয়, তবে আমরা এই ঐতিহাসিক বিজয় একসাথে উদ্থযাপন করব। অন্যথায় ইরানি জাতির সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যাব।’
১০ দফা প্রস্তাবে তেহরানের কঠোর শর্ত : আগামী ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার বিস্তারিত সামনে এসেছে। এই প্রস্তাবগুলোতে ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো- হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার, মিত্র শক্তির নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ মুক্তি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা।
আজ বা কাল হরমুজ খুলে দিতে পারে ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় বৈঠকের আগে একটি যুদ্ধবিরতি কাঠামো চূড়ান্ত হলে আগামীকাল বৃহস্পতি বা পরদিন শুক্রবার হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে পারে তেহরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। যুদ্ধের সময় ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধবিরতি সমঝোতার অংশ হিসেবে তেহরান এই প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। রয়টার্সকে ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ইরানের সামরিক বাহিনীর সাথে সমন্বয় করেই এই নৌপথ আবার খুলে দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
টোল নেবে ইরান-ওমান : দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলার সময় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি (টোল) নেয়ার পরিকল্পনা করেছে ইরান ও ওমান। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে।
খবরে আরো বলা হয়েছে, এই তহবিলের অর্থ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে খরচ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে সিএনএনের পক্ষ থেকে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এখনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধবিরতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিজয় : ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘটনাকে পাকিস্তানের ‘বড় কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকেই ইসলামাবাদ আড়ালে থেকে মধ্যস্থতা শুরু করে। ওয়াশিংটনে ইরানের স্বার্থ রক্ষাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের অনন্য অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ইরান সব পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক এই সাফল্যে মূল ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক তৎপরতায় ট্রাম্পের ডেডলাইনের আগমুহূর্তে এই সমঝোতা আসে। ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে পরবর্তী টেকসই শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব ও কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বৈশ্বিক প্রভাব : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও আমেরিকার যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানায়, গত পাঁচ সপ্তাহে এই যুদ্ধে ইরানে মোট তিন হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৯০০ জন।
লেবানন : লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে এক হাজার ৫৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১২৯ শিশু রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে দু’টি পৃথক ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের তিনজন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। তারা ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। লেবাননে নিহতের তালিকার আরো আছেন সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মী।
ইরাক : সঙ্কট শুরুর পর থেকে ইরাকে অন্তত ১১৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইসরাইল : ইসরাইলের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার তথ্যানুযায়ী, ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটিতে মোট ২৩ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের ১১ জন সেনা নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র : যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ১৩ জন সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ তথ্য জানিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত : দু’জন সেনাসহ মোট ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
কাতার : কাতারের জলসীমায় গত ২২ মার্চ ‘নিয়মিত দায়িত্ব পালনের’ সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে সাতজন নিহত হয়েছেন।
কুয়েত : সাতজন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিমতীর (ফিলিস্তিন): ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে চারজন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন।
সিরিয়া : দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের শহর সুয়েইদায় একটি ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে চারজন নিহত হন।
বাহরাইন : ইরানের দু’টি পৃথক হামলায় দু’জন নিহত হয়েছেন।
ওমান : দেশটির সোহর প্রদেশের একটি শিল্পাঞ্চলে গত ১৩ মার্চ ড্রোন হামলায় দু’জন নিহত হয়েছেন।
সৌদি আরব : রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আল-খারজ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে দু’জন নিহত হয়েছেন।
ফ্রান্স : উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলের অবস্থান নিয়ে সংশয় : ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও ইসরাইল এই সিদ্ধান্ত মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। আলজাজিরার প্রতিনিধিরা বলছেন, ইসরাইল সাধারণত মার্কিন প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করে, তবে তারা হিজবুল্লাহ বা ইরানের অন্যান্য মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ করবে কি না, তা অনিশ্চিত।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি মনে করেন, আমেরিকার সক্রিয় সমর্থন ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে ইরানের সাথে একা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ট্রাম্পের ইচ্ছা উপেক্ষা করে ইসরাইল বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলেই তার ধারণা। আপাতত এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে, কারণ বিকল্প পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আগামী দুই সপ্তাহ এখন কূটনীতির টেবিলে সবার নজর থাকবে।
লেবাননে ভয়াবহ বিমান হামলা : লেবাননজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সমন্বিত বিমান হামলায় ‘শত শত’ মানুষ হতাহত হয়েছেন। মাত্র ১০ মিনিটে রাজধানী বৈরুত, বেকা ভ্যালি ও দক্ষিণ লেবাননের ১০০টিরও বেশি স্থানে আঘাত হানে ইসরাইল। হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হলেও মূলত ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকাগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরুদ্দিন জানিয়েছেন, শহীদ ও আহতদের ভিড়ে হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে দেশটিতে বর্তমানে এক চরম মানবিক বিপর্যয় চলছে।
এ দিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো রকম আপস ছাড়াই এবং বিরতিহীনভাবে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, উত্তর ইসরাইলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আক্রমণ ‘থামবে না’ এবং প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানো হবে।
৫ দেশকে ধন্যবাদ জানালেন শাহবাজ শরিফ : ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনের জন্য চীন, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও মিসরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, এই দেশগুলোর অমূল্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার ফলেই ধ্বংসাত্মক সঙ্ঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জিসিসি দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, আমেরিকা ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও ধৈর্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। শাহবাজের মতে, সম্মিলিত এই আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাই সঙ্কট সমাধানের পথ প্রশস্ত করেছে।
ইসলামাবাদে আলোচনায় নেতৃত্বে যারা : শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আগামীকাল শুক্রবার এ আলোচনা হওয়ার কথা। পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিতব্য এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিতে পারেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আর ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফের। ইরানের সংবাদমাধ্যম আইএসএনএ এই তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ‘শোচনীয় পরাজয়’: রাশিয়া
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ‘বিনা উসকানিতে একপক্ষীয় ও আগ্রাসী হামলা’ চালিয়েছে। এ যুদ্ধে দেশ দু’টি ‘শোচনীয় পরাজয়’ বরণ করেছে। স্পুতনিক রেডিওকে গতকাল বুধবার মারিয়া বলেন, ‘আমাদের দেশ একেবারে শুরু থেকে, প্রথম বিবৃতিতেই বলেছিল, এ আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। এ পরিস্থিতির কোনো সামরিক সমাধান নেই।’
তেহরানের রাজপথে উচ্ছ্বাস : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- দু’পক্ষই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। এ খবরে রাজপথে নেমে উল্লাস করেছেন ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ভোরে তেহরানের পথে পথে মিছিল হয়েছে, স্লোগান হয়েছে। যুদ্ধ আপাতত থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যে।
বিশ্বপ্রতিক্রিয়া
চীন ও রাশিয়া : চীন একে সঙ্কটে বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে রাশিয়া একে পশ্চিমা উসকানিমূলক নীতির পরাজয় দাবি করে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ ও ভারত : জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ভারত সংলাপ ও কূটনীতিকে অপরিহার্য বলে অভিহিত করে হরমুজ প্রণালীতে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যের আশা প্রকাশ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য : সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ওমান, মিসর ও তুরস্ক এই সমঝোতাকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং হরমুজ প্রণালী মুক্ত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
পশ্চিম ও ওশেনিয়া : জার্মানি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড একে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ইউক্রেন এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের এমন ‘দৃঢ়তা’ দাবি করেছে।
‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ আখ্যা ইসরাইলি নেতার : ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ একে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছেন। লাপিদ অভিযোগ করেন, জাতীয় নিরাপত্তার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল, ইসরাইল তখন আলোচনার টেবিলে থাকার সুযোগ পর্যন্ত পায়নি। তার মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে নেতানিয়াহু যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।



