‘গুনাই গাজী আইল সাজি।/ সঙ্গী সাথী লিয়ে (নিয়ে)।/ তিরপা কুকি তাড়িয়ে দিলো/ বন্দুক আওয়াজ দিয়ে।’
ফেনীর লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই কবিতা। গুনাই গাজী, মনগাজী, চানগাজী, শুয়াগাজী, সোনাগাজী, ফুলগাজী- ইত্যাদি স্থানীয় লোক গুনাই গাজীর সাথী ছিলেন। শুয়াগাজীর নামে পরবর্তী সময়ে শুয়াগঞ্জ বাজারের নাম হয়। বাজারটি কুমিল্লা সদর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ও চৌদ্দগ্রাম থানার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত।
শুয়াগাজী কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক মরহুম মৌলভী আশরাফ উদ্দিন চৌধুরীর পিতা এবং বিএনপির কুমিল্লা নেত্রী রাবেয়া চৌধুরীর দাদা। মনগাজী, চানগাজী ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার অন্তর্গত। সোনাগাজী উপজেলা ফেনী জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত। ফুলগাজী উপজেলা ফেনীর উত্তরাংশে অবস্থিত। ক্যাপ্টেন লিক্ রোড পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার সংযোগ। কবি নজরুলের স্মৃতিবাহী- ‘বাহার আনে গুলশানে গুল,/ নাহার আনে আলো।’ বাহার-নাহার দুই ভাই-বোনের স্মৃতি বহনকারী গুথুসা গ্রামের পাশ দিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে।
কর্নেল অলি আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত) যখন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ছিলেন বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভায় ১৯৯৫ সালের দিকে, তখন স্থানীয় জনগণ দাবি জানান, রাস্তাটি সংস্কারের। তিনিও কথা দিয়েছিলেন; কিন্তু কাজ হয়নি।
ক্যাপ্টেন লিক্ একজন ইংরেজ ছিলেন। তার নামে এ রোড ছিল; যা চালু হলে আঞ্চলিক পরিবহনের ইতিহাস বদলে যেত। ক্যাপ্টেন লিক্ রোড গুনাই গাজীর কবিতার সাথে সংশ্লিষ্ট।
ত্রিপুরা কুকিদের অত্যাচারে বাঙালিরা অতিষ্ঠ ছিল। একটি বাড়ির খবর আমরা জানতে পারি, প্রসূতি এক মহিলা আশ্রয় নিয়েছিলেন চারমুখঅলা ভেতরে, তাকে সেখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ত্রিপুরা কুকিরা এমনই অত্যাচার চালিয়েছিল।
দক্ষিণ বাংলার ভাটির বাঘ শমসের গাজী। ১৭৩০-৬২ ইংরেজি আনুমানিক জীবনকাল। তিনি একদিন ক্যাপ্টেন লিক্ রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে এক হিন্দু বাড়ি থেকে ক্রন্দনের ধ্বনি আসছিল। এগিয়ে গিয়ে খবর নিলেন, শুনলেন সতীদাহ প্রথার কথা। তখন তিনি সতীদাহ প্রথার সংস্কার করেন। তিনি ফেনীর শাসক ছিলেন। ক্যাপ্টেন লিক ঐতিহাসিক রোড সংস্কার করা হলে ইতিহাসের নতুন দিক উন্মোচিত হতো; কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফেনীর অনেক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মতো এটিও বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
কুকি চিন বা নাগা উপজাতির বাস ভারতের মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ডে অবস্থিত। বাংলাদেশের বান্দরবানে এদের বাস।
মৌদক মৌয়াল, পালেত্তোয়া এদের কারণে দু’টি পরিচিত নাম। এরা কুকি চিন মিয়ানমারের চিন প্রদেশে বাস করে। এ জন্য চিন নামে এরা পরিচিত। এরা কয়েক মাস আগে কেসিএনএলএফ বান্দরবানের কয়েকটি ব্যাংক দখল করেছিল। কেসিএনএলএফ অর্থ- কুকি চিন জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট। ফেনীর কুকিদের বংশধররা বান্দরবানে, মিয়ানমারে ও ভারতে বাস করছে। এরা খোলা ছুরি হাতে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। ভারতের মনিপুর রাজ্যে এরা গণ্ডগোল করছে।
সম্প্রতি এদের একজন চার হাজার ৭০০ যুদ্ধের পোশাক ফেলে চট্টগ্রামের পুলিশের হাত থেকে পালিয়েছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



