মুখোমুখি বিজিবি-বিএসএফ

সীমানা নির্ধারণ নিয়ে উত্তপ্ত সীমান্ত : ২ যুগে ৭ বার সম্মুখযুদ্ধ

বলপ্রয়োগের পর সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ শূন্যরেখায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি গাড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ঘটনা নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে সীমান্ত এলাকায়। গতকাল দ্বিতীয়বার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা করলে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে বিজিবির প্রবল বাধায় বিএসএফ কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

বলপ্রয়োগের পর সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ শূন্যরেখায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি গাড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ঘটনা নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে সীমান্ত এলাকায়। গতকাল দ্বিতীয়বার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা করলে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে বিজিবির প্রবল বাধায় বিএসএফ কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

এদিকে গত ২৫ বছরে বিএসএফের সাথে সীমান্ত এলাকায় সাত বার মুখোমুখি সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে। সাতটি ঘটনায় বিজিবি বা বিডিআরের পাঁচজন ও বিএসএফের ১৮ জন নিহত হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও বিজিবির স্থানীয় ক্যাম্প সূত্র জানায়, বিএসএফ অন্যায় করতে এলেই জীবন দিয়ে হলেও প্রতিহত করা হবে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক ৩০৫ জন বাংলাদেশী নিহত এবং অন্তত ২৮২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭ বছরে বিএসএফ কর্তৃক মোট ৬১৮ জন বাংলাদেশী বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ৮০২ জন আহত হয়েছেন। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের পর চলতি বছর ১৮ মে পর্যন্ত বিজিবি-বিএসএফ আর কোনো সম্মুখযুদ্ধে জড়ায়নি।

বিজিবি সূত্র জানায়, এর আগে গত ১৮ মে দুপুর সাড়ে ১২টায় দহগ্রাম বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ডিএএমপি ৬/১৬-এসের কাছে শূন্য লাইন থেকে ১০-২০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে প্রতিপক্ষ ১৭৪ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ তরুণ ক্যাম্পের সদস্য কর্তৃক ১৫টি বাঁশের খুঁটি স্থাপন করতে এলে বিজিবির বাধায় পিছু হটে চলে যায়।

গতকাল দহগ্রাম বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা সীমান্ত পিলার ডিএএমপি ৭/৩০-এসের কাছে ফের বিএসএফ কর্তৃক বাঁশের খুঁটি স্থাপন অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালায়। তাৎক্ষণিক বিজিবি টহলদল জোড়ালো প্রতিবাদ জানালে বিএসএফ খুঁটি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পরবর্তীতে উক্ত সীমান্তের নিকটবর্তী স্থানে ৪-৫ সেকশন বিজিবি সদস্য এবং ভারতীয় অংশে প্রায় ৪০-৫০ জন বিএসএফ সদস্য প্রতিরক্ষায় অবস্থান নেয়। উদ্ভুত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবি-বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে টেলিকমিউনিকেশনের মাধ্যমে বিএসএফ কর্তৃক যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করলে এবং বিএসএফ উক্ত স্থান ত্যাগ করলে বিজিবি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসে এবং বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিজিবির রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি) লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার কুচলিবাড়ি ইউনিয়নের কলসিরমুখ সীমান্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে শূন্যলাইনে খুঁটি স্থাপনের অপচেষ্টা চালায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কড়া আপত্তি ও কঠোর অবস্থানের কারণে খুঁটি অপসারণে বাধ্য হয় বিএসএফ।

বিজিবি সূত্র জানায়, শূন্যলাইনে নিয়মবহির্ভূতভাবে খুঁটি স্থাপনের অপচেষ্টা চালায়। বিষয়টি স্থানীয় জনগণ ও বিজিবির নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবির কলসিরমুখ বিওপির সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানায় এবং ঘটনাস্থলে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে অবিলম্বে স্থাপিত খুঁটি অপসারণের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। বিজিবির অনড় ও কড়া অবস্থানের মুখে বিএসএফ সদস্যরা তাদের কার্যক্রম থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং স্থাপিত খুঁটি দ্রুত অপসারণ করে নেয়।

এ ব্যাপারে রংপুর ব্যাটালিয়নের (৫১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ সীমান্ত এলাকায় খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল। বিষয়টি জানার পর বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে এবং কড়া প্রতিবাদের কারণে বিএসএফ তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে উক্ত সীমান্ত এলাকায় বিজিবি স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় ও পেশাদার ভূমিকা পালন করে যাবে।

রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান আরো জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ২টায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তী পশ্চিম গিয়ারপাড়া এলাকায় ভারতীয় চোরাকারবারিদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ফায়ার করেছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন, রাতের আঁধারে কলসিমুখ বিওপির টহলদল দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের মেইন পিলার-৮০৬ এলাকায় নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছিল বিজিবি সদস্যরা। এ সময় ভারতের দিক থেকে তারকাঁটা পেরিয়ে কিছু চোরাকারবারিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পশ্চিম গিয়ারপাড়া এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করতে দেখে বিজিবি টহলদল চোরাকারবারিদেরকে চ্যালেঞ্জ করে। চোরাকারবারিরা বিজিবির নির্দেশ অমান্য করে বিজিবি টহলদলের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং চোরাকারবারিদের সতর্ক করার লক্ষ্যে বিজিবির টহল সদস্যরা ফায়ার করে। ফায়ারের পর চোরাকারবারিরা দ্রুত ভারতের অভ্যন্তরে পালিয়ে যায়।