ইঁদুরের উৎপাতে দিশেহারা ছিলেন হ্যামেলিনের বাসিন্দারা। সেই সময় এসে হাজির হলেন অদ্ভুত এক বাঁশিওয়ালা। জাদুর বাঁশিতে ইঁদুরগুলো নদীতে ডুবিয়ে মারলেন তিনি। নিস্তার পেলেন হ্যামেলিনের বাসিন্দারা। কিন্তু এরপর সেই বাঁশিওয়ালাকে চেনার দরকার মনে করলেন না শহরের মেয়র। পরিণতি কী হলো? শহরের শিশুদের হারাতে হলো। বাঁশিওয়ালার মায়াবী সুর শিশুদের নিয়ে গেল পাহাড়ের রহস্যময় গুহায়। তারা আর ফিরে এলো না।
জার্মানির শহর হ্যামেলিনের শিশুরা এভাবে হারিয়ে যেত না, বাসিন্দারা যদি নৈতিক হতেন। নীতিহীনতা ছোঁয়াচে সমস্যা, মেয়র নীতিহীন হলে নাগরিকদেরও ছুঁয়ে যায়, নাগরিকদের মধ্যে নীতির আকাল থাকলে মেয়রের পক্ষেও নীতি ঠিক রাখা কঠিন। হ্যামেলিনে তাই হয়েছিল। আমাদের সমাজেও হচ্ছে। তাকিয়ে দেখুন না সংবাদপত্রগুলোতে, রাজধানীতে শিশু রামিসা হত্যায় তোলপাড় হচ্ছে দেশ। চট্টগ্রামে ধর্ষণের শিকার হয়েছে চার বছরের শিশু। গত চার মাসে ধর্ষিত হয়েছে ১১৮ কন্যাশিশু। খুন হয়েছে ১৭ শিশু। এক হিসাবে দেখা গেছে, গত ২০ মাসে ধর্ষণ ও নির্যাতনে ৬৪৩ শিশু মারা গেছে। এগুলো কেন হচ্ছে?
নীতির আকালে। এই আকালে মহররম-গাইরে মহররমের ভেদরেখা লোপ পায়। প্রতিবেশী বিবাহিত যুবকের চোখ যায় সাত বছরের রামিসার দিকে। আমাদের এখানে হ্যামিলিনের কোনো বাঁশিওয়ালা নেই। আছে নীতিহীনতা। এই নীতির অভাবে আমাদের ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছে একেকটা দানব। এরা দূরের কেউ নয়- আমাদের চার পাশের মানুষ, খুব চেনা আপনজন।
এই যে চেনা মানুষের মুখোশ খুলে পড়ার ‘উৎসব’, একে আমরা কী নামে ডাকব? একে কি কেবল ‘অপরাধ’ বলে দায় সেরে ফেলা যায়? নাকি এগুলো সমাজ ভেঙে পড়ার আলামত?
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য বলছে, এ বছর জানুয়ারি থেকে মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ১১৮ কন্যাশিশু ভয়াবহ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আরো ৪৬ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়। ১৪ শিশুকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে খুন করা হয়েছে আরো তিন শিশুকে। ট্রমা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে দুই শিশু। শুধু মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ধর্ষণ হয়েছে ২৪ শিশু। হত্যা করা হয়েছে পাঁচ শিশুকে।
পুলিশ সদর দফতরের হিসাব বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে সারা দেশে মোট ১১৫ শিশু খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর এ চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৮টি। এ সময়ের মধ্যে চাইল্ড হেল্পলাইনে শিশু যৌন হয়রানি সংক্রান্ত কল এসেছে পাঁচ হাজার ৮৫৩টি, এগুলোর মধ্যে ৫২০টি ছিল সরাসরি ধর্ষণের ঘটনা।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩টি শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর নিহত হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনের বেশি শিশু, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় একটি করে শিশু আমাদের দেশে স্রেফ হিংস্রতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে।
পরিসংখ্যান দিতে গেলে আরো দেয়া যাবে, একের পর এক আসবে- বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো। আসলে আমাদের নৈতিকতার বাঁধ ভেঙে গেছে। প্লাবনের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসন, পারিবারিক বন্ধন।
শিশুরা এখন আমাদের কাছে রেসের ঘোড়া। আর তাদের মা ও বাবারা রেসের জকি, পেছন থেকে চাবুক হাতে তাড়িয়ে বেড়ান জিপিএ পাঁচ পেতে। শিশুদের স্কুলে দেয়া হয়। তার আগে একদফা প্রাইভেট, স্কুলের পর আরো দুই দফা। আর সন্ধ্যার পর ‘চাবুক’ হাতে বসে থাকেন ‘জকি’রা। শিশুরা যখন স্কুুলে থাকে, ‘জকি’রা তখন আড্ডা দেন। অথবা কেনাকাটায় মজে থাকেন। তাদের ‘রেসের’ শিশুরা কারো বিকৃত লালসার শিকার হচ্ছে কি না, সে খোঁজ রাখার সময় কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ পাঁচ ঘটনা বিশ্লেষণ করে অপরাধ বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনায় শিশুরা তাদের প্রতিবেশী, কোনো কাছের আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠদের শিকার হয়েছে।
মানুষের ভেতরে বসত করে দুই প্রবৃত্তি। একটি মানবিক, অন্যটি পাশবিক। শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবার, সমাজে সুস্থ চর্চায় মানবিক প্রবৃত্তি জাগে। আর ভেতরের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে জেগে ওঠে পাশবিকতা। আইনের প্রয়োগ কঠোর থাকলে সমাজে পাশবিকতা কম দেখা যায়। একটি শিশুধর্ষণের মামলা যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, এর বিচার না হয় অথবা আইনের ফাঁক গলে ধর্ষক বেরিয়ে যায়, তাহলে সেটি ধর্ষণ প্রবণতাকে উর্বর করে। এ প্রবণতা ছোঁয়াচে হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে ধর্ষণের আইনে কড়াকড়ি আছে; কিন্তু প্রয়োগে ততটা নেই। আছে অনেক অপপ্রয়োগও। এ কঠোর আইনের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে মিথ্যা মামলা করা হয়। একটি ধর্ষণের মামলা ঠুকে দিয়ে ‘চৌদ্দগোষ্ঠী’কে হয়রান করতে চায় তারা। এতে মামলার চাপ বাড়ে। অসাধু পুলিশ সদস্যদের বাণিজ্য বাড়ে। অনেকসময় সত্য-মিথ্যার ধাঁধায়ও পড়ে যান বিচারকরা। পার পেয়ে যায় অপরাধী। আসলে ধর্ষণের যতগুলো মামলা হয়, দেখা গেছে এসবের বেশির ভাগ মিথ্যা। ধর্ষণের নামে ব্ল্যাকমেইলের সংস্কৃতি ও বিচারহীনতায় প্রকৃত ভুক্তভোগীরা আইনি লড়াইয়ে নামতে লজ্জা পান। তার মনেও দ্বিধা থাকে- তার এই ন্যায়বিচার চাওয়াটাও মানুষ সুবিধাভোগীদের পাল্লায় মেপে বসতে পারে। এতে প্রকৃত নির্যাতিতরা মুখ বুজে সহ্য করে যান। আর এভাবে সহ্য করতে করতে রোগটা ছড়িয়ে যেতে থাকে প্লাবন হয়ে।
ধর্ষণের মতো অপরাধ কখন বেশি হয়, সেই হিসাবও বের করে আনা হয়েছে পুলিশ সদর দফতরের মামলার ডাটাবেজ থেকে। দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়তে শুরু করে শীতের শেষে, বসন্তে। নভেম্বর শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এর ‘মৌসুম’ চলে। অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে গরমের সময় ধর্ষণ বেশি হয়। ওই সময় শরীরের ভেতরের হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে। এতে মানুষের সহনশীলতা কমে যায়, আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তা ছাড়া আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলে অনেকে রোমান্টিক হয়ে যান। পরিসংখ্যান বলছে, বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরের ধর্ষণ-ঘটনা বেশি ঘটে। ভেজা আবহাওয়া মানুষের আদিম পাশবিকতা জাগিয়ে তোলে। আরো একটা অদ্ভুত তথ্য হলো- বেলা ১১টা থেকে ৩টার মধ্যে এ ধরনের অপরাধ বেশি সংঘটিত হতে দেখা যায়।
তাহলে কি সব দায় আবহাওয়ার, বিষয়টা কি এমন? না, মোটেও না। আগেই বলা হয়েছে, মানুষের ভেতর বসত করে দুই প্রবণতা- মানবিক ও পাশবিক। পাশবিককে যিনি দমিয়ে রাখতে পারেন, তিনিই মানুষ।
দেশে আইনের শাসন দুর্বল হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসলে মানুষের পাপবোধ উধাও হয়ে যেতে থাকে। একেকজন বন্ধনহীন হয়ে ওঠে। কারণ আইন তাকে ছুঁতে পারবে না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের উর্বর করে। পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট দিতে দেরি করে। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করাতে পোড়াতে হয় কাঠখড়। আইনের এই মারপ্যাঁচের সুযোগ নেয় অপরাধীরা। অন্য দিকে প্যাঁচে পড়ে ‘স্ক্রু’ হয়ে বের হয়ে যান ভুক্তভোগীরা। রামিসার মতো কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে কেবল সবকিছু প্রায় ঠিকঠাকমতো চলতে শুরু করে। মধ্যরাতে ভিকটিমের বাড়িতে ছুটে যেতে দেখা যায় সরকারপ্রধানকে। তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় ডাকসাইটে আইনজীবীদের। অপরাধী গ্রেফতার হয়, জবানবন্দীও নেয়া হয়। তারপরও কি এগুলোর সুরাহা হয়? হয় না। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার পর ঘটনা আসতে থাকে। অন্য কোনো ঘটনার চাপে একদিন হয়তো আড়াল হয়ে যাবে রামিসার ঘটনাও। তখন সব সিস্টেম ঝুলে পড়তে শুরু করবে। ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে আগের সেই গতি। মাগুরার সেই ছোট্ট শিশু আছিয়ার কথা কি আমাদের মনে আছে? তাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তার পরিবার ঠিকঠাক বিচার পেয়েছে কি না, সেই খোঁজ কি আমরা রাখছি?
বিচার না হওয়ার এই সংস্কৃতির পেছনে দায় আছে রাজনীতির। দীর্ঘদিন থেকে আমাদের রাজনীতিতে সামাজিক সমস্যাগুলো উপেক্ষিত। এখানে রাজনীতি মানে- ক্ষমতার ভাগাভাগি আর পেশিশক্তির মহড়া। পেশিশক্তির জন্য নানারকম গ্যাং তৈরি করতে হয়। পাড়া-মহল্লায় বানাতে হয় ‘কিশোর গ্যাং’।
২০২৩ সালে ইতালিতে একটিমাত্র কিশোরের অপরাধে পুরো রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসেছিল। ফিলিপ্পো তুরেত্তো নামের ওই কিশোর তার প্রেমিকা জুরিয়া সেচেত্তিনকে সত্তরবার ছুরি মেরে হত্যা করে। পরে লাশ প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে খাদে ফেলে দেয়। ওই ঘটনায় সেখানকার সরকার কেবল পুলিশ পাঠিয়ে বা গতানুগতিক তদন্ত করে দায় সারেনি। হাত দিয়েছিল মূল সমস্যায়। প্রতিটি স্কুলে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো বাধ্যতামূলক করেছিল। পাশাপাশি অপরাধ দমনে কিশোরদের মনস্তত্ত্ব পাল্টে দেয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিয়েছিল সরকার।
আর আমাদের দেশে? ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন হত্যার পর সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ২০১৬ সালে কুমিল্লার তনু হত্যার পর আন্দোলন হলো। তারপরও কেন রামিসাকে মরতে হলো? সরকার কি অপরাধ দমনে দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক শিক্ষা বা সচেতনতার কর্মসূচি নিয়েছে?
আমাদের সমাজে যারা নৈতিকতার কথা বলেন, নীতি ফেরি করে বেড়ান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নসিহত করেন, লম্বা লম্বা প্রবন্ধ লেখেন; তার সেই নীতিগুলো বাস্তব জীবনে কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কিভাবে একটা শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, নারী অধিকার রক্ষা করতে হবে- এসব প্রায়োগিক দিকে জোর দেন না।
নৈতিকতার এই চরম পতনের পেছনে অর্থনৈতিক সঙ্কটকেও অস্বীকার করা যায় না। ওই যে, ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরে দু’মুঠো খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। জেঁকে বসেছে বেকারত্ব। জীবনে টিকে থাকার লড়াই করতে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে মানুষকে। এতে মানসিক ভারসাম্য তছনছ হয়ে যাচ্ছে। এ তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ও হতাশা থেকেও পাপবোধ জন্ম নেয়।
অভাব থেকে অনেকসময় সবকিছু পেয়ে যাওয়ার অতিরিক্ত আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। শর্টকাটে পয়সাওলা হতে চায় মানুষ। এই হতে চাওয়া থেকে অনৈতিক দিকে ঝুঁকে যায় তারা।
অনৈতিকতা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক- এই চার ব্যর্থতার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আমরা। আর আমাদের সামনে নির্মম পরিণতি নিয়ে হাজির হয়েছে হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। এখন তার ঝুলি থেকে বের হয়ে এসেছে প্রতিশোধের বাঁশি। সম্মোহনী বাঁশির সেই সুর সর্বনাশা।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



