নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে কোনো ধরনের ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে ‘নির্মোহভাবে’ কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
গতকাল রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও দর্শনের কথা তুলে ধরেন। গত ২৫ মার্চ তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পেলেও এদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে দাফতরিক কার্যক্রম শুরু করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনে দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি সাংবিধানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ও তার আদর্শিক অবস্থানের সাথে আমার দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতা ছিল, এটি সত্য। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমার সেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শ আমাকে কখনোই প্রভাবিত করবে না।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমি কোনো দলের নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে ‘রাষ্ট্রের’ অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছি। আমি রাষ্ট্রের স্বার্থে, রাষ্ট্রের কল্যাণে এবং রাষ্ট্রের পক্ষেই সবসময় কথা বলে যাব। রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত (অ্যাবস্ট্রাক্ট) সত্তা হলেও তা সরকারের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। সুতরাং রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের নীতি-নৈতিকতা, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের সাথে জনগণের স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন, ইনশাআল্লাহ আমি নির্মোহভাবে তা করে যাব।’
বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশের বিষয়ে মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোতে তিনটি অঙ্গ (নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ) স্বাধীন এবং স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। নির্বাহী বিভাগ তার নিয়মে চলে। দীর্ঘদিন পার্লামেন্ট না থাকলেও এখন তা এসেছে এবং পার্লামেন্ট সার্বভৌম। একইভাবে বিচার বিভাগও সার্বভৌম।’
জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্র করে আদালতে অনেক বিষয় উত্থাপিত হবে, এমন পরিস্থিতিতে কোনো চাপ অনুভব করছেন কি না- এই প্রশ্নে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘আমি একজন অভিজ্ঞ (সিজনড) আইনজীবী। তাই আইনগতভাবে সংবিধানের ব্যাখ্যা দিতে বা আইনি লড়াইয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো চাপ অনুভব করি না। আমি অনেক সময় মজা করে বলি যে- ওকালতিটাই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে করতে পারি। আজকের এই নিয়োগ আমার পেশাগত উৎকর্ষেরই একটি স্বীকৃতি। এই চ্যালেঞ্জ শুধু আগামী দিনে নয়, অতীতেও আমি সফলভাবে নিয়েছি।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে কার্যকর করতে সাংবাদিকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে আমি নিজেও একসময় সাংবাদিকতা করেছি। তাই আমি অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাসী। তবে একই সাথে অপতথ্য কিংবা এআই (অও) দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে মানুষ যেন প্রতারিত না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সঙ্কুচিত হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি প্রধান বিচারপতিকে আগেই অবহিত করেছি। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন ব্যক্তি এবং ইতোমধ্যে উনার ভালো কাজের স্বাক্ষর রেখেছেন। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, আনুষ্ঠানিকভাবে আলাপকালে আপনাদের এই উদ্বেগটি আমি আবারো উনার কাছে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরব। আমি বিশ্বাস করি, তিনি এ ব্যাপারে আপনাদের পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।’
বার কাউন্সিলের বর্তমান নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস কাজলের জন্ম ১৯৭০ সালের ১৯ নভেম্বর ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৯৫ সালে তিনি আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কিছুকাল সাংবাদিকতাও করেছেন।
পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে সিটি ইউনিভার্সিটির অধীনে আইন বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন এবং ২০০৬ সালে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ সনদ লাভ করেন। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে ২০০৮ সালে তিনি আপিল বিভাগে ওকালতি করার অনুমতি পান।
রাজনৈতিকভাবে কাজল ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন এবং বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে তিনি প্রথম সারিতে ছিলেন। ২০২৪ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট গণনা সংক্রান্ত একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে আইনি সহায়তা সাব-কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক পথচলা শেষে এখন তিনি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।



