স্বাধীনতা ঘোষণার বিরুদ্ধে তাইওয়ানকে ট্রাম্পের সতর্কতা

Printed Edition

বিবিসি

চীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার বিরুদ্ধে তাইওয়ানকে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেখানে যুদ্ধ কিংবা আন্দোলন কোনোটাই দেখতে চান না।

চীন সফর ও শি জিনপিংয়ের সাথে দুই দফা বৈঠক শেষে মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই না কেউ (তাইওয়ান) স্বাধীন হোক।’ যদিও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং তে আগে বলেছিলেন, তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তাইওয়ান এরই মধ্যে নিজেকে ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এমনকি আইনগতভাবেও তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার উপায়-উপকরণ দিতে বাধ্যবাধকতা রয়েছে দেশটির। প্রায়ই এ বিশেষ মিত্রতা এবং চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে সমন্বয় করে চলতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। ট্রাম্প অবশ্য আগে বলেছিলেন, স্বশাসিত দ্বীপটি সম্পর্কে তিনি কোনো দিকেই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে বরাবর দাবি করে এসেছে চীন। এমনকি চীনা কর্তৃপক্ষ বলপূর্বক তাইওয়ান দখল করার আশঙ্কা কখনো উড়িয়ে দেয়নি। অন্য দিকে মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ওয়াশিংটন তাইওয়ানের স্বাধীনতা সমর্থন করে না। পাশাপাশি বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে নিচ্ছে যে চীনে সরকার একটিই (এক চীন নীতি)। অন্য দিকে বেইজিং কখনো তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে পছন্দ করেনি। এ নিয়ে চীন বরাবর সরব। এর আগে তাকে ‘ঝামেলা সৃষ্টিকারী’ ও ‘আন্তপ্রণালী শান্তি বিনষ্টকারী’ বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

তাইওয়ানের অধিবাসীদের অনেকে নিজেদের স্বতন্ত্র একটি জাতির অংশ মনে করেন। তবে বেশির ভাগই এখনকার পরিস্থিতি জিয়িয়ে রাখার পক্ষে। অর্থাৎ চীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে না; আবার দেশটির সাথে একীভূতও হবে না। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প জানান, তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনি জানেন, যুদ্ধ করতে হলে আমাদের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাইল (১৫ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার) দূরে যেতে হবে। আমি সেটা চাই না। আমি চাই, পরিস্থিতি শান্ত হোক। চীনও শান্ত হোক।’ বেইজিং থেকে ওয়াশিংটন ফেরার পথে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এবারের চীন সফরে তিনি ও শি জিনপিং দ্বীপটি (তাইওয়ান) নিয়ে ‘অনেক কথা’ বলেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে তাইওয়ানকে রক্ষা করবে কি না, বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান ট্রাম্প। তিনি জানান, তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিং খুবই ‘শক্ত অবস্থান’ নিয়েছেন। তিনি তাইওয়ানে কোনো স্বাধীনতা আন্দোলন দেখতে চান না।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে তাইওয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ইস্যু। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, বৈঠকে ট্রাম্পকে সতর্ক করে শি বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে বিদ্যমান বিরোধ ঠিকঠাকমতো সামলানো না গেলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে কোনো সঙ্ঘাত দেখছেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমি তা মনে করি না। আমি মনে করি, আমরা ঠিকই থাকব। (শি জিনপিং) যুদ্ধ দেখতে চান না।’ তাইওয়ানের আশপাশে গত কয়েক বছরে সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে চীন। এর ফলে অঞ্চলটিতে উত্তেজনাও বেড়েছে। সেই সাথে তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত বছরের শেষের দিকে তাইওয়ানের কাছে এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আওতায় তাইওয়ানকে আধুনিক রকেট লঞ্চার ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দেয়ার কথা। এর নিন্দা জানিয়েছে বেইজিং। অস্ত্র বিক্রির এ প্যাকেজ এগিয়ে নেয়া হবে কি না, বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ও চীনের প্রেসিডেন্ট ‘বিশদ’ আলোচনা করেছেন।

ট্রাম্পের সতর্কবার্তা উড়িয়ে নিজেদের স্বাধীন দাবি করল তাইওয়ান

বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মাথায় তাইওয়ান নিজেদের ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র হিসেবে পুনরুল্লেখ করেছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সতর্কবার্তায় গণতান্ত্রিক এই দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাইওয়ান একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং এটি কোনোভাবেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অধীনস্ত নয়। তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার বিষয়ে ট্রাম্পের ইঙ্গিতের পর, মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে যে এই অস্ত্র বিক্রি তাইওয়ানের প্রতি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিরই একটি অংশ।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি কেবল ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা একটি মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিই নয়, বরং এটি আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে একটি যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাইওয়ানের এই কড়া বক্তব্য এমন সময়ে এলো যার ঠিক একদিন আগেই বেইজিং সফর শেষ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, যেন যুক্তরাষ্ট্র এই স্বশাসিত দ্বীপটিকে কোনো ধরনের সমর্থন না দেয়। চীন শুরু থেকেই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে।