জুলাই সনদকে বাদ দিয়ে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে না : নাগরিক সংলাপে বক্তারা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি জুলাই সনদকে বাদ দিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। ফ্যামেলি কার্ড করেই দল টিকিয়ে রাখা যাবে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কারের জন্য ৬৮ শতাংশ জনগণ হ্যাঁ ভোট দেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এই ব্যাপারে এখানো পর্যন্ত সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি সরকার। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম ও ভয়েস ফর রিফর্মের আয়োজনে ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে এ কথা বলেন বক্তারা।

সংলাপে বক্তারা বলেন, আন্দোলনের পরবর্তী সময় একটি দেশ সাজানোর আসল সময়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন আমরা দেখছি না। আমরা এটা চাইনি একজন ক্ষমতা ছেড়ে দিলে অন্যজন তা দখল করবে। আইনের কথা বলে সংস্কার বাদ দেয়া যাবে না। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দল জুলাই সনদের শপথ নেয়নি। এতে করে আগামীতে শঙ্কিত হবার কারণ রয়েছে। সংসদের অধিবেশনের পরে দেখতে হবে দেশ কোন দিকে যায়। আপনি যদি গণভোটকে অস্বীকার করেন তাহলে জনগণই তা প্রতিহত করবে।

তারা আরো বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে আমরা সংস্কার করার কথা বলে আসছি। বিশেষ করে পুলিশ ও প্রশাসনের কিন্তু তা হয়নি। এর ফল হিসেবে সম্প্রতি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণিত। আমাদের দেশে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে তার মতো সংবিধান চালায়। এজন্যই সংবিধান সংস্কার আগে দরকার। বিএনপি আগে সংস্কার নিয়ে কথা বলেনি। কারণ তারা ভেবেছিল, না করলে নির্বাচন দেরি হয়ে যাবে। এগুলো জনগণের সাথে প্রতারণা। জবাবদিহিতার জন্য রাজনীতির সংস্কারও দরকার।

সংস্কার ঐকমত্য কমিশনের সাবেক মেম্বার হাসিব বলেন, আন্দোলনের কারণেই নির্বাচন হওয়া সম্ভব হয়েছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। সংস্কারের আকাক্সক্ষা থেকেই গণভোট হয়েছে। কারণ মানুষের আকক্সক্ষা ছিল পরিবর্তন হবে। কিন্তু বিএনপির মতো দল শপথ নিলেন না। তারা হয়তো এটাকে সংসদ নির্বাচন পেয়েছেন কিন্তু ভুলে গেছেন এটি জুলাই সনদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়েছে। তাই সবার উচিত জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে চাপে রাখা। দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। আইনের কথা বলে সংস্কারকে ঢিলে করার কোনো সুযোগ নেই।

জুলাই রাজবন্দী অ্যালাইন্সের আহ্বায়ক মাহিন পাটোয়ারি বলেন, ২০২৪ সালে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশ সংস্কার করা। যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। হাসিনা শুধু একজন ফ্যাসিস্ট ছিল না, সে একটি সিস্টেম ছিল। তাই তার রেখে যাওয়া কোনো পদ্ধতি রাখা যাবে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দৃশ্যমান কাজ দেখা যায়নি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনেক সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া সংবিধান যুগের প্রয়োজনে সংস্কার করা দরকার। আর এজন্যই গণভোট হয়েছে।

রাজনীতিবিদ রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, একটি আন্দোলনের পর সমাজে সংস্কার করার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন চাইলেই দেশের প্রয়োজনে সংস্কার সম্ভব হয়। আমরা এখনো অন্ধকারে পড়ে আছি। ৫৪ বছরের এই অবস্থা থেকে বের হতে দরকার হলে আবারো আন্দোলন করতে হবে। কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধানের কিছু সংস্কারের কারণে অনেকে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। তাই সেই সংবিধানের অজুহাতে জুলাই সনদ সংস্কারে বাধা হওয়া যাবে না। ইসিহাসে যারাই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে তারা কখনো দলকে সঠিকভাবে চালাতে পারেনি। এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে বলা হয় কিলার অব ডেমোক্র্যাসি। এতে করে দেশে অপরাধ বেড়ে যায়। এই অন্ধকার থেকে বের হতে না পারলে জাতির ভবিষ্যত কখনো ভালো হবে না। আবারো গুম-খুন, আয়নাঘরের মতো পরিবেশ তৈরি হবে। তবে জনগণ চাইলে এই অবস্থা ভাঙতে পারে। নিজেকে বাঁচাতে হলেও এই সংস্কার প্রয়োজন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যায়ের শিক্ষার্থী ওমামা ফাতেমা বলেন, গত ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন পরিবর্তন হবে বলে ধারণা ছিল। সব কিছুই হয়নি। বলা হয়েছিল কিছুর বিচার হবে। কিন্তু সরকার বার বার পেছনে চলে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো আবারো ফ্যাসিস্ট কাঠামোতে ফিরে এসেছে। কেন এখনো পুলিশের আচরণ পরিবর্তন হয়নি? কেন মাত্র ৬১ জন গ্রেফতার হয়েছে? বাকিরা কোথায়? সরকারকে এজন্য ভোগতে হবে। কারণ আমলাদের কথামতোই দেশ চলছে। আমলারা চাচ্ছে না জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হোক। তাছাড়া আমলারা বিভিন্ন সময় গুজব ছড়িয়ে সমস্যা তৈরি করছে।

তিনি আরো বলেন, বিএনপি জুলাই সনদকে বাদ দিতে গেলে টিকে থাক কষ্টকর হবে। তাছাড়া গণভোটকে বাদ দিলে দেশের বিরোধী গোষ্ঠীরা সক্রিয় হয়ে উঠবে। এজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দরকার। এ ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত সংস্কার দরকার। মানুষ পরিবর্তন চায় আবার স্বভাবিক জীবনকেও বাদ দিতে চায় না। দুঃখের বিষয় হলো বিএনপি চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখতে চাচ্ছে। অথচ ৫ আগস্টের পরেই তার চলে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু দয়া দেখিয়ে রেখেছি। আমরা চাই না আওয়ামী লীগের লোক থাকুক। নতুন করে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবে। দেশের মানুষের অনেক আশা আছে রাজনৈতিক দলের কাছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এক হাজার ৪০০ ব্যক্তির প্রাণ দিয়েছে কিসের জন্য? নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত করার জন্যই এই আন্দোলন। নির্বাচন হয়ে গেছে, বিচারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন শুধু সংস্কার বাকি আছে। ৪৮টি বিষয়ের জন্য সব রাজনৈতিক দলের মতের ভিত্তিতে সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়। সবাই অঙ্গীকার করেছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। তাছাড়া গণভোটে এটা জয়ী হয়েছে তাই এটা বাস্তবায়নে সরকার বাধ্য। গণভোট সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ এখানে জনগণ সরাসরি মতামত দেয়। জুলাই সনদ পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে শহীদদের রক্তকে অবমূল্যায়ন করা হবে।