নিজস্ব প্রতিবেদক
খাল পুনঃখননকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- শুধু খনন নয়, খাল পুনরুদ্ধারকেও জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, স্থানিক পরিকল্পনা, জলবায়ু অভিযোজন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সাথে যুক্ত করতে হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে সংস্থার নিজস্ব কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘খাল পুনঃখনন কর্মসূচি : পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থানিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত’বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব মন্তব্য করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, লেক, জলাভূমি ও নিম্নভূমি শুধু পানি ধারণের জায়গা নয়, এগুলো কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, খাল দখল ও প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবক্ষয়ের কারণে পানি ব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরনের স্থানিক পরিকল্পনা সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে ঢাকা ও অন্যান্য নগর এলাকায় খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাট হওয়ায় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নগর বন্যা ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় জলাভূমি কমে যাওয়ার সাথে সাথে নগরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ৬৯ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। একই সময়ে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৪৪ ডিগ্রি থেকে ৯ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সরকার খাল পুনঃখননকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেকোনো উন্নয়ন কর্মসূচি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পেলে তার বাস্তবায়ন ও ফলাফল তুলনামূলক ভালো হয়। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য পানি সংরক্ষণ, মৎস্য চাষ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধারে খালের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, খাল দখল ও জলাশয় ভরাটের কারণে দেশের বহু খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার নষ্ট হয়ে গেছে।
খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে নতুন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শেখ মেহেদী আহসান বলেন, আগের ধাঁচে একইভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে আবারো হতাশা তৈরি হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি বা কৃষি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। খাল পুনঃখননকে কেবল প্রকৌশলগত প্রকল্প হিসেবে না দেখে সমন্বিত নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, খাল পুনঃখননকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শুধু খনন কার্যক্রম চালালেই হবে না, এর সাথে পানিপ্রবাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্তকরণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখননের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পলি জমে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খালের গভীরতা কমে যায়। ফলে পুনঃখননের সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।



