ব্যবসায়ীকে অপহরণ আয়নাঘরে নির্যাতন চাঁদাবাজি ও সাজানো মামলার অভিযোগ

ভয়ঙ্কর অভিযোগের মুখে এসপি রিয়াজ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সুপার (এসপি) রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ, পিপিএম। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এবার উঠে এসেছে অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, সাজানো মামলা এবং ‘ক্রসফায়ার’ হুমকির মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগ।

আইটি ব্যবসায়ী ও সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম রুমেলের অভিযোগ, তৎকালীন র‌্যাব কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাকে দুই দফা তুলে নিয়ে ‘আয়নাঘর’-সদৃশ স্থানে নির্যাতন করা হয়। এমনকি ভিডিওকলে তাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেয়ার নির্দেশও দেন এসপি রিয়াজ। পরে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে প্রায় দুই মাস কারাগারে রাখা হয়।

ঘটনার তদন্তে নেমে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতির তথ্য পেয়েছে। বিশেষ করে রুমেলের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেখান থেকে তাকে গ্রেফতারের দাবি করা হয়েছিল, ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না।

ভুক্তভোগী রুমেলের দাবি, পরিচয়ের সূত্র ধরে এসপি রিয়াজ উদ্দিনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বিভিন্ন সময় অসুস্থতা, সফটওয়্যার প্রকল্প এবং পরিচিত এক কেয়ারটেকারের মেয়েকে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে মোট ৩৫ লাখ টাকা নেয়া হয়। পরে মাত্র ৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে বাকি অর্থ পরিশোধে টালবাহানা শুরু করেন রিয়াজ।

রুমেলের ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে একপর্যায়ে ৩০ লাখ টাকার একটি চেক দেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে টাকা না থাকায় সেটি ডিজঅনার হয়। টাকা ফেরত চাইতে থাকলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

রুমেল বলেন, ‘আমি বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দেয়ার পর থেকেই আমাকে হুমকি দেয়া শুরু হয়। পরে অপহরণ, নির্যাতন ও সাজানো মামলার মাধ্যমে আমাকে চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়।’

শিশুসন্তানকে বুকে নিয়েই অপহরণ

প্রথম দফার ঘটনার বর্ণনায় রুমেল জানান, ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তার বাসায় ঢুকে পড়ে। তখন তার ১১ দিনের শিশুসন্তান তার বুকে শুয়ে ছিল।

তার ভাষায়, ‘তারা শিশুটিকে সরিয়ে দিতে বলে। স্ত্রী ও মাকে ধাক্কাধাক্কি করে। বাসার মোবাইল, সিসিটিভি ডিভাইস ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, সেসব ডিভাইসে এসপি রিয়াজের সাথে কথোপকথন ও টাকা লেনদেনের তথ্য ছিল।’

অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর তাকে র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে নির্যাতন শুরু হয়।

তারেক রহমানকে তথ্য সরবরাহের অভিযোগ

রুমেলের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে বলা হয়, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে তথ্য সরবরাহের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্যাতনের একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি ফোনের তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। এরপর সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়া হয়। ভিডিও কলে এসপি রিয়াজ আমার কাছে ২২ লাখ টাকা দাবি করেন।

রুমেলের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে জোর করে লিখিয়ে নেয়া হয় যে ‘রিয়াজ উদ্দিন আমার কাছে ২২ লাখ টাকা পাবে’।

দ্বিতীয় দফা অপহরণ ও ক্রসফায়ার হুমকি

দ্বিতীয় দফায় ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট বনশ্রী এলাকা থেকে তাকে তুলে নেয়া হয় বলে দাবি করেন রুমেল। তার অভিযোগ, কয়েকজন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ও একটি কালো মাইক্রোবাস ব্যবহার করে তাকে অপহরণ করে র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে আবারো নির্যাতনের সময় ভিডিও কলে তাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেয়ার নির্দেশ দেন এসপি রিয়াজ।

রুমেলের বর্ণনা অনুযায়ী, উপস্থিত এক মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা এতে আপত্তি জানিয়ে বলেন ‘তার ১১ দিনের বাচ্চা আছে, অতীত রেকর্ডও ভালো। যেকোনো মামলা দিয়ে চালান করে দিন।’ রুমেলের দাবি, জবাবে এসপি রিয়াজ বলেন, ‘শালাকে ফেলে দেন, এটা আমার জন্য ডিস্টার্ব।’

লাশ দেখেছি

নির্যাতনের ভয়াবহতার বর্ণনায় রুমেল বলেন, তাকে এমন একটি কক্ষে নেয়া হয়েছিল যেখানে দু’টি লাশ পড়ে ছিল। একজনের মাথায় গুলির চিহ্ন এবং অন্যজনের হাত-পা কাটা ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

এরপর তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় এক হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মামলা দেয়া হয়। সেই মামলায় তাকে প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকতে হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তার অডিও : মামলাটি ছিল সাজানো

ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- মামলার বাদি হিসেবে থাকা র‌্যাব-১-এর তৎকালীন ওয়ারেন্ট অফিসার ইকবাল হোসেনের একটি অডিও রেকর্ড।

অডিওতে তিনি বলেন বলে দাবি করা হয়েছে- ‘সিনিয়র অফিসারদের চাপে পড়ে মামলাটি করেছি। ঘটনাটি ছিল সাজানো। সাক্ষ্যপর্যায়ে গেলে এমনভাবে সাক্ষ্য দেব যাতে বিষয়টি আপনার পক্ষে যায়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইকবাল হোসেনও গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি মামলা করেছিলেন।

সিআইডির ফরেনসিকে মিলল অসঙ্গতি

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দ্বিতীয় দফায় রুমেলকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে আটক দেখানো হলেও তার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় তার মোবাইল ফোনের অবস্থান ছিল রামপুরার বনশ্রী এলাকায়। একই সাথে মাদককারবারি-সংশ্লিষ্ট কোনো কথোপকথনও পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত এসপির বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এসপি রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ভুল করেছি। এ জন্য আমার জীবন তছনছ হয়ে গেছে। আমি তাকে নির্যাতন করেছি, এ জন্য আমাকে মাফ করবেন। তবে যেহেতু মামলা হয়েছে, আদালতের রায়ই চূড়ান্ত।’

তার এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ এটি আংশিক স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন অনেকে।

রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে রিয়াজ উদ্দিন প্রশাসনিক সুবিধা নিতেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের একটি ডিও লেটারেও তাকে ‘আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

বদলি না জবাবদিহি?

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রিয়াজ উদ্দিনকে প্রথমে কুড়িগ্রামে বদলি করা হলেও পরে সেই আদেশ বাতিল হয়। সর্বশেষ তাকে ৮ এপিবিএনে সংযুক্ত করা হয়।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রুমেল বলেন, ‘বদলি কোনো শাস্তি নয়। যারা আয়নাঘরে নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত।’

বৃহত্তর প্রশ্ন

এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে কয়েকটি বড় প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ছিল?

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির অভিযোগ কতটা সত্য?

‘আয়নাঘর’, গুম ও সাজানো মামলার অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচার কি হবে?

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই মামলার তদন্ত ও বিচার কেবল একজন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণ করবে না; বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।