নিজস্ব প্রতিবেদক
হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন, ‘বন্দুকযুদ্ধের নাটক’ সাজিয়ে মেহেরপুরে শিবির নেতাকে হত্যা এবং যশোরে দুই নেতার পায়ে গুলি করে পচন ধরানোর পর পা কেটে ফেলার পৃথক দু’টি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আইনি প্রক্রিয়ার সময় পিছিয়েছে। এর মধ্যে সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনসহ আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে ট্রাইব্যুনাল আরো দুই মাস সময় বাড়িয়েছেন। অন্য দিকে যশোরের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আট আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ও সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের তারিখ পিছিয়ে আগামী ১৬ জুন ধার্য করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন। এ দিন দু’টি মামলারই শুনানির পূর্বনির্ধারিত দিন ধার্য ছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনসহ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গতকাল সোমবার দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্ত কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে আরো দুই মাস সময় চেয়ে আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৯ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এর আগে, সোমবার সকালের দিকে কড়া নিরাপত্তায় কারাগার থেকে গ্রেফতার থাকা সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এ কে এম নাহিদুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি মেহেরপুর জেলা শিবিরের তৎকালীন সভাপতি তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আটকের পর সাজানো বন্দুকযুদ্ধের নাটক তৈরি করে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন। গত বছরের ২৪ আগস্ট সাইফুল হত্যা মামলায় সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
যশোরের ২ শিবির নেতার পা কাটার মামলা
এ দিকে যশোরের চৌগাছায় হেফাজতে নির্যাতনের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলি ও অমানুষিক নির্যাতনের মামলায় তৎকালীন বহুল আলোচিত এসপি আনিসুর রহমানসহ আট আসামির বিরুদ্ধে গতকাল সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু প্রসিকিউশনের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে আগামী ১৬ জুন নতুন তারিখ ধার্য করেছেন।
সোমবার সকালে এই মামলায় গ্রেফতার তিন আসামি চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হককে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তবে মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন বিতর্কিত এসপি আনিসুর রহমানসহ পাঁচজন এখনো পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিরা হলেন- তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান; চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান; তৎকালীন এসআই মোখলেছ; তৎকালীন এসআই জামাল; তৎকালীন এসআই মাজেদুল। এর আগে গত ২০ এপ্রিল এই আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের সময় আদালতে উপস্থিত গ্রেফতার আসামিরা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছিলেন।
প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনকে একটি মিথ্যা মামলায় আটক করে পুলিশ। এরপর তাদের আইনানুযায়ী আদালতে হাজির না করে, টানা দুই রাত আটকে রেখে নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে অধীনস্থ পুলিশ সদস্যরা গভীর রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধের নাটক’ সাজিয়ে ওই দুই নেতার পায়ে সরাসরি গুলি করে।
শুধু গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি তৎকালীন পুলিশ। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছটফট করতে থাকা ওই দুই শিবির নেতার ক্ষতস্থানে অত্যন্ত নৃশংসভাবে বালু ঢুকিয়ে দেয়া হয় এবং তা গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে মিথ্যা অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হয়। ক্ষতস্থানে বালু ঢোকানোর কারণে পা দু’টিতে মারাত্মক পচন ধরে। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুজনেরই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে পুলিশের করা ওই কথিত অস্ত্র মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো প্রমাণিত হয়।



