বিশেষ সম্পাদকীয়

জুলাইয়ের বীজ, আজকের অঙ্কুর

পরিচর্যায় বেড়ে উঠুক মহীরুহ : সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর

Printed Edition

আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর এই দিনটি কেবল একটি ভোটের দিন নয়; এটি মাটির গভীরে পোঁতা একটি বীজের অঙ্কুরোদগমের দিন। আজ সেই দিন, যেদিন গণতন্ত্রের বীজ মাটি ফুঁড়ে চারা হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে এই বীজ রোপণ হয়েছিল। বাংলাদেশে জুলাই মানেই বৃক্ষরোপণের আহ্বান; সেই জুলাইয়েই জন্ম নিয়েছিল নতুন আশার চারা। তবে আমরা জানি, শুধু চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; চারা টিকিয়ে রাখতে দরকার যতœ ও পরিচর্যা। অনেক সময় দেখা যায়, উৎসাহ নিয়ে গাছ লাগানো হয়। পরে আর সেই গাছের খোঁজ নেয়া হয় না। এতে সম্ভাবনাময় চারা শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসও অনেকটা তেমনি। পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য বলা হয়। বলা যায়, পঞ্চম নির্বাচন থেকেই প্রকৃত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই যাত্রার পেছনে ছিল নতুন প্রত্যাশা। মানুষ ভেবেছিল, এই চারা একদিন মহীরুহ হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চারার যথাযথ পরিচর্যা হয়নি। দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতার একচেটিয়া দখলে গণতন্ত্রের ডালপালা ছাঁটাই হয়েছে বারবার। শেষ পর্যন্ত তা শুকিয়ে গিয়েছিল।

আবার সুযোগ এসেছে আজ। জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রথমত, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে নিজেদের মতামত জানাবেন। দ্বিতীয়ত, নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এই দুই সিদ্ধান্ত মিলেই নির্ধারণ হবে গণতন্ত্র-চারা বৃক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো আমাদের স্মৃতিতে এখনো রক্তাক্ত ও জ্বলন্ত। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা বুকের ভেতর সাহস আর হাতে পতাকা নিয়ে নেমেছিল রাজপথে। তারা জানতো- তাদের সামনে তাক করা আছে গুলি, গ্রেফতার, নির্যাতন এবং শাহাদত। তবু পিছু হটেনি ছাত্র-জনতা। তাদের অনেকেই আজ শহীদ, অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। এই ত্যাগ কেবল একটি মাস বা একটি আন্দোলনের নয়; এটি আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ১৯৪৭ সালে, ১৯৭১ সালে অসংখ্য মানুষ এই ভূখণ্ডের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। পরবর্তী সময়েও স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অনেকে বিচারবহির্ভূত ও বিচারিক হত্যার শিকার হয়েছেন। সেসব শহীদের রক্তেই লেখা হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস। আজকের এই দিনে আমরা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাদের ত্যাগের ঋণ নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে আরো দৃঢ় করে তোলে।

জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর প্রমাণ করে, সংস্কারের প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে কেবল একটি প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নয়; এটি রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ, ইনসাফভিত্তিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ করার অঙ্গীকার। এটি এমন এক কাঠামো গড়ার প্রতিশ্রুতি, যেখানে আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বৈরশাসক হয়ে জনগণের ঘাড়ে চাপবে না। গণতন্ত্রের চারাটিকে সজীব রাখতে চাইলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় অনিবার্য। এর মাধ্যমে গাছের শেকড় শক্ত হবে, কাণ্ড দৃঢ় হবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে নানা অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কোনোরকম বিভ্রান্তি যেন ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, তার জন্য সতর্ক থাকা জরুরি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপ্রমাণিত খবরে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।

একই সাথে জনপ্রতিনিধি বেছে নেয়ার ক্ষেত্রেও ভোটারদের প্রজ্ঞা অপরিহার্য। অতীতে আমরা দেখেছি, জনবিচ্ছিন্ন নির্বাচনে গঠন হওয়া সংসদ জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না ঘটিয়ে ক্ষমতাসীনদের বন্দনার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার সময় এসেছে। এমন প্রতিনিধি বেছে নিতে হবে, যিনি সৎ, যোগ্য, দক্ষ এবং সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে থাকবেন।

এই নির্বাচন কলুষমুক্ত রাখা সবার দায়িত্ব। একটি কালো দাগও যেন না পড়ে, এমন প্রত্যাশা জাতির। বিশ্বকে দেখাতে হবে, বাংলাদেশ পারে; বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে এগোতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আজ যে চারা মাটি ফুঁড়ে উঠবে, তাকে কেউ যেন কেটে ফেলতে না পারে, এজন্য জনগণের সতর্ক দৃষ্টি প্রয়োজন। যদি ভুল হয়, তাহলে এর মাশুল দিতে হবে গোটা জাতিকে।

যারা বিজয়ী হবেন, তাদের মনে রাখতে হবে- গণতন্ত্র বৃক্ষটি কারো একার না, সবার। বিরোধী মত, ভিন্ন কণ্ঠ এবং সমালোচনা গণতন্ত্রের বেঁচে থাকার পানি ও আলো। আর যারা জয় পাবেন না, ফলাফল মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে তাদের। জনগণের সিদ্ধান্তকেই জয় হিসেবে মানতে হবে। কোনো দল নয়, হতে হবে গণতন্ত্রের বিজয়। গণতন্ত্রের বাগানে নানা ফুল ফুটবে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিহিংসা নয়।

আজ সিদ্ধান্ত নেবেন জনগণ। তারা যাদেরকে উপযুক্ত মনে করবেন, তাদের হাতেই দায়িত্ব দেবেন। এই দায়িত্ব এক পক্ষের নয়, পুরো জাতির। সঠিক সিদ্ধান্ত, সদিচ্ছা ও ধারাবাহিক পরিচর্যায়ই আজকের চারাগাছটি একদিন বড় বৃক্ষে পরিণত হবে। তখন বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়াবে সমতা, ন্যায় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।